ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। প্রায় দুই দশক ধরে দেশের ক্রিকেট প্রশাসনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতাসীনদের ছায়া, পছন্দের লোকদের জায়গা করে দেওয়া কিংবা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ বারবার উঠেছে। তবে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা আগের অনেক বিতর্ককেও ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট–সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একজন সংসদ সদস্য বিসিবির অ্যাডহক কমিটিকে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, বোর্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রী-এমপি ও ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের সন্তানদের উপস্থিতি। সেই মন্তব্য পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্রিকেট অঙ্গনের আলোচনায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক সেই বিতর্কের আবহেই বিসিবির ২১তম পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আর সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখগুলোর একজন তামিম ইকবাল চার বছরের জন্য বিসিবির ১৭তম সভাপতি নির্বাচিত হলেন।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে তামিমকে যখন ‘বাপের দোয়া’ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি হাস্যরসের সুরে বলেন, ‘অনেকে অনেক রকম ট্যাগ দিচ্ছেন। দেখি বাপের দোয়া থেকে ক্রিকেটের দোয়া করতে পারি কি না।’
তামিমের এই মন্তব্যে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে হাসির রোল উঠলেও এর পেছনে ছিল বিসিবির বর্তমান বাস্তবতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। কারণ নির্বাচনের আগেই প্রায় নিশ্চিত ছিল যে তিনিই সভাপতি হচ্ছেন। কাউন্সিলর মনোনয়ন, পরিচালক নির্বাচন এবং পরে সভাপতি নির্বাচন—পুরো প্রক্রিয়াই অনেকের কাছে ছিল পূর্বনির্ধারিত।
গত বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার সঙ্গে সহসভাপতির দায়িত্ব পেয়েছিলেন ফারুক আহমেদ ও শাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু মাত্র আট মাসের মাথায় সেই বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়। গত ৭ এপ্রিল সরকার বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে এবং তার নেতৃত্বে আনা হয় তামিমকে।
অ্যাডহক কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বোর্ডের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। ক্রিকেট অঙ্গনের অনেকেই মনে করছিলেন, পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে তামিমই স্থায়ীভাবে বোর্ডের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটেছে।
নির্বাচনে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে পরিচালক হয়েছেন ১২ জন। তামিম নিজেও ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাবের কাউন্সিলর হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ৭৪ ভোটের মধ্যে ৭৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। পরে পরিচালকদের ভোটে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
তবে নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে নতুন পরিচালনা পর্ষদের গঠন নিয়ে। নির্বাচিত পরিচালকদের তালিকায় রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহীম, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরু এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির। এর আগে অ্যাডহক কমিটিতেও মন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, বোর্ডে নতুন মুখ আসা কিংবা তরুণ নেতৃত্ব তৈরি হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু যখন সেই নতুন মুখগুলোর বড় অংশ রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আলোচনায় আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে বোর্ডের স্বাধীনতা নিয়ে।
ক্রিকেট প্রশাসনের ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। একসময় বোর্ড পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা। দীর্ঘ সময় ধরে বিসিবির নেতৃত্বে ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন সংসদ সদস্য ও সরকারের মন্ত্রী। তার আমলেও বোর্ডে রাজনৈতিক প্রভাবের সমালোচনা হয়েছিল। তার আগে আ হ ম মুস্তফা কামালও জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। ফলে ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতির সম্পর্ক বহু পুরোনো।
ক্রিকেট সংগঠকরা বলেন, সমস্যাটি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্ন। বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যদি ক্রিকেটের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশি প্রভাবিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেলাটিই।
তামিম অবশ্য এই সমালোচনা সরাসরি অস্বীকার করেননি। বরং সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্বীকার করেছেন, গত এক-দেড় বছরে ক্রিকেটের অনেক দুর্নাম হয়েছে এবং সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না।
তিনি বলেন, ‘সামনে অনেক কঠিন পথ আসবে। আমরা ভুল করব। ভুল থেকে শিখে সঠিক কাজ করব। কিন্তু ক্রিকেটের ওপরে কোনো কিছু ত্যাগ করব না। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত সবাইকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হবে। গত এক-দেড় বছরে এখানে ঘাটতি ছিল।’
তামিমের বক্তব্যে বোঝা যায়, তিনি অতীতের নানা বিতর্ক সম্পর্কে সচেতন। তবে তিনি কারও বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনতে চাননি। তার ভাষায়, ‘গত এক-দেড় বছরে যা হয়েছে, তার জন্য আমি কাউকে দোষারোপ করব না। কারও দিকে অভিযোগের আঙুল তুলব না। তবে যা হয়েছে, সেটা স্বীকার করতেই হবে।’
নতুন সভাপতি হিসেবে তামিমের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আস্থার সংকট দূর করা। জাতীয় দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, ঘরোয়া ক্রিকেটের অব্যবস্থাপনা, বয়সভিত্তিক কাঠামোর দুর্বলতা, ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন, নির্বাচক প্যানেল ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগে নানা বিতর্ক—সব মিলিয়ে ক্রিকেট প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বোর্ডকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে নিয়ে আসা। বিসিবি আইনগতভাবে একটি স্বশাসিত ক্রীড়া সংস্থা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন সময়ে সরকার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। ফলে নতুন বোর্ডকে শুধু ক্রিকেটীয় সাফল্য নয়, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পরীক্ষাও দিতে হবে।
তামিম সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি কোনো প্যানেল ঘোষণা করেননি, কারণ এতে নির্বাচন একতরফা হয়ে যেত। তার দাবি, ক্লাব ক্যাটাগরিতে যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে এবং সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন হলো, প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ভোটের মাঠে নয়; কাউন্সিলর নির্বাচনের পর্যায় থেকেই যদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে চূড়ান্ত ভোটের প্রতিযোগিতা কতটা অর্থবহ থাকে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই মিলবে না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের একজন এখন বোর্ডের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্বে। মাঠে ব্যাট হাতে যেমন প্রত্যাশার ভার বহন করেছেন, এবার তাকে বহন করতে হবে দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের দায়িত্বও।
‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ নিয়ে যতই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হোক, শেষ পর্যন্ত তামিমের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার বিচার হবে অন্য জায়গায়। তিনি কি বোর্ডকে রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে রাখতে পারবেন? তিনি কি ক্রিকেটার, ক্লাব, জেলা সংগঠন ও সমর্থকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবেন? তিনি কি ঘরোয়া ক্রিকেটের সংস্কার এবং জাতীয় দলের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন? চার বছর পর এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে তামিম ইকবাল সত্যিই ‘বাপের দোয়া’ থেকে ‘ক্রিকেটের দোয়া’য় রূপান্তর ঘটাতে পেরেছিলেন কি না।
খবরটি শেয়ার করুন