শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ব্যাটারির রিকশার সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিমি, নিবন্ধন ফি ৮-১০ হাজার টাকা *** ১ লাখ ৩১ হাজার ভোট ব্যবধানে বিজয়ী ধানের শীষ, আজ বিক্ষোভ জামায়াতের *** বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ১৭তম লন্ডন বাংলা বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব *** ভোটকেন্দ্রে জাল ভোটের চেষ্টা, হাতেনাতে ধরা তিন শিক্ষার্থী *** ‘অনেক বিচারক বেলা ১১টায় আসেন, দেড়টা-দুইটায় চলে যান—এটা চলবে না’ *** বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার: এখনই মন্তব্য করতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** ফের মার্কিন হামলা হলেও কয়েক মাস টিকে থাকার খাদ্য–জ্বালানি মজুত আছে ইরানের *** আজ ঢাকায় গাইবেন পাকিস্তানের মুর্তজা কিজিলবাশ *** দিল্লিতে পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ জানাল ভারত *** শুধু ব্যবস্থা নেওয়া নয়, অপরাধের ঝুঁকি কমানো আমাদের লক্ষ্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শাপলা চত্বরের মৃত্যু বিতর্ক: পুরোনো প্রশ্নে নতুন আলোচনার ঢেউ

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ১১:৫১ অপরাহ্ন, ৬ই মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনাবলি নিয়ে বিতর্ক থামেনি এক দশকেরও বেশি সময় পরেও। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের বক্তব্য এবং একই সঙ্গে বিবিসি বাংলা সার্ভিসের সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফার পুরোনো মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং পাল্টা বিশ্লেষণের ঢেউ দেখা যাচ্ছে।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গত ৪ মে দেশের জাতীয় গণমাধ্যমকে জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে মোট ৫৭ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন এবং চট্টগ্রামে ৫ জন নিহত হন। তিনি আরও দাবি করেন, এসব ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলমান এবং তদন্ত কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হয়েছে সাবির মুস্তাফার একটি ভিডিও বক্তব্য, যেখানে তিনি ২০১৩ সালের ৫ মে রাতের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। প্রায় তিন মিনিটের ওই ভিডিওতে তিনি বলেন, সেদিন রাতে শাপলা চত্বরে নির্দিষ্ট করে কোনো হত্যাযজ্ঞ বা মৃত্যুর ঘটনা তিনি বা তার সহকর্মীরা প্রত্যক্ষ করেননি। তার দাবি, বিবিসির দুই প্রতিবেদকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের বহু সাংবাদিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তাদের প্রতিবেদনে সেই রাতে হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায় না।

সাবির মুস্তাফা তার বক্তব্যে বলেন, “ওখানে বিবিসির রিপোর্টিংয়ে কোনো দুর্বলতা ছিল না। আমাদের দুইজন রিপোর্টার ছিল, তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। অনেক সাংবাদিক ও টিভি ক্রু সেখানে ছিল। কিন্তু কেউই কোনো হত্যাযজ্ঞ দেখেনি বলে আমি মনে করি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ যে নিহতের তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেগুলোতেও শাপলা চত্বরে ওই রাতের অভিযানে নিহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই বক্তব্য তিনি শুধু একটি আলোচনায় নয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েও পুনর্ব্যক্ত করেন। সেখানে তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে শত শত মানুষের মৃত্যুর যে খবর ছড়িয়েছিল, তা যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার মতে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিবিসির সংবাদদাতা রাতভর অবস্থান করেও কোনো ‘লাইভ ফায়ারিং’ বা মৃত্যুর প্রমাণ পাননি।

তবে সাবির মুস্তাফার এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতও রয়েছে। হেফাজতে ইসলামের নেতারা তার মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সংগঠনটির একাধিক নেতা দাবি করেছেন, ওই রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে, যা যথাযথভাবে গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়নি।

প্রথম আলোর তৎকালীন প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, ৫ মে দিনভর ঢাকায় সহিংসতা, সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। রাতে যৌথবাহিনী শাপলা চত্বরে অবস্থানরত হেফাজত কর্মীদের সরিয়ে দিতে অভিযান চালায়। সে সময় গুলির শব্দ, লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে তখনই বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যা আজও পুরোপুরি নিরসন হয়নি।

বর্তমানে এই বিতর্ক নতুন করে জোরদার হওয়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিও ক্লিপ, পুরোনো সংবাদ এবং ব্যক্তিগত মতামত মিলিয়ে এক ধরনের ‘ডিজিটাল বিতর্ক’ তৈরি হয়েছে।

নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়াও বিভক্ত। ঢাকার বাসিন্দা আরিফ হোসেন লিখেছেন, “যদি সত্যিই এত বড় হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, তাহলে তার স্পষ্ট প্রমাণ কোথায়? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট তো অন্য কথা বলছে।” অন্যদিকে মাহমুদা আক্তার মন্তব্য করেছেন, “সবকিছুই কি গণমাধ্যমে আসে? অনেক কিছুই চাপা পড়ে যায়। তাই শুধু রিপোর্ট দিয়ে সত্য নির্ধারণ করা ঠিক না।”

আরেকজন ব্যবহারকারী তানভীর রহমান লিখেছেন, “সাবির মুস্তাফা একজন আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিক। তার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে অন্য সূত্রও যাচাই করা দরকার।” বিপরীতে নাসির উদ্দিন মন্তব্য করেন, “তার বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। তাই একে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া যাবে না।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান। একটি ঘটনার একাধিক বর্ণনা থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন পক্ষের ভিন্ন দাবি থাকে। এখানে প্রয়োজন হচ্ছে স্বাধীন তদন্ত ও তথ্যের স্বচ্ছতা।

মানবাধিকার গবেষকদের মতে, হতাহতের সংখ্যা বা ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলে তা নিরসনে বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই প্রক্রিয়াও হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ।

তবে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার একটি অংশে যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ডানপন্থী কিছু ব্যবহারকারী সাবির মুস্তাফার বক্তব্যের সমালোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রবণতা মূল আলোচনাকে দুর্বল করে এবং সত্য অনুসন্ধানের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

সাংবাদিকতা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাবির মুস্তাফার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন কাজ করা ব্যক্তির বক্তব্য গুরুত্ব পাওয়াটা স্বাভাবিক। তার অভিজ্ঞতা ও পেশাগত মানদণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে একই সঙ্গে অন্য তথ্যসূত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, শাপলা চত্বরের ২০১৩ সালের ঘটনা এখনো দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। একদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান, অন্যদিকে জনমত বিভক্ত। নতুন করে আলোচনার এই ঢেউ হয়তো সত্য উদঘাটনের পথকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে—যদি তা তথ্যভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর এবং সহনশীল আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে যায়।

প্রসঙ্গত, শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালে হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, হাসান মাহমুদ খন্দকার ও বেনজীর আহমেদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

সাবির মুস্তাফা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250