ছবি: সংগৃহীত
দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে আজ শনিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন ব্লিটজ পত্রিকার সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী। সেখানে তিনি মানবাধিকারকর্মী ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত আইরিন খানকে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখার পক্ষে মত দেন এবং এ নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তার পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্ট্যাটাসে সাংবাদিক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী আইরিন খানের শিক্ষাজীবন, পারিবারিক পটভূমি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আইরিন খান আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত একটি নাম। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হিসেবে তিনি ইতিহাসে প্রথম নারী, প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তি ছিলেন। পরে জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা–বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সালাউদ্দিন শোয়েবের ভাষ্য অনুযায়ী, আইরিন খান রাষ্ট্রপতি হলে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে।
পোস্টে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনার খবর জানার পর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তিনি জানতে পারেন যে আইরিন খান পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক তার পোস্টে অভিযোগ করেন, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে আইরিন খানের নাম সামনে আসা ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তিনি এ ঘটনাকে "আইরিন খান ঠেকাও মিশন" হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আইরিন খানকে নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা কোনো প্রভাব ফেলবে না।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী লেখেন, আইরিন জুবাইদা খান, যিনি গোটা বিশ্বে আইরিন খান নামে সুপরিচিত। মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের সপক্ষে এক আপোষহীন কণ্ঠস্বর। তিনি ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর সিলেটের বিরাহিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সিকান্দার আলী খান একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক এবং দাদা আহমেদ আলী খান ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতে স্নাতক। পেশায় একজন ব্যারিস্টার আইরিন খানের প্রপিতামহ আবিদ খান আফগান বংশোদ্ভূত। তার চাচা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। ১৯৬৪-৭২ সালে আইরিন খান ঢাকা শহরের সেন্ট জেভিয়ার্স গ্রিন হেরাল্ড স্কুলের সব পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন।
তিনি বলেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা আইরিন খানের মনে প্রচণ্ড দাগ কাটে, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে তিনি গণহত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ভীষণ সোচ্চার হয়ে ওঠেন। চুয়াত্তর সালে আইরিন খান ব্রিটেনে চলে যান এবং ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল স্কুল (হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন) থেকে আন্তর্জাতিক আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত আইরিন খান পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হলে ইউনুসের জঙ্গি শাসনামলে ক্ষুণ্ন হয়ে যাওয়া দেশের ভাবমূর্তি শুধু পুনরুদ্ধারই করবেন না, তিনি বাংলাদেশকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস। মঙ্গলবার দুপুরে যখন নিশ্চিতভাবে জানতে পারি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর পদত্যাগ করবেন, তখনই অন্য একটা বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, আইরিন খানই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। খবরটা জানার পর থেকেই আমি বুঝেছি, ইউনূস গ্যাং এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাবে যেকোনো উপায়ে কেন আইরিন খানকে আটকে দিতে। কারণ তারা জানে, একজন আইরিন খানের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা আর উচ্চতার সামনে সুদখোর ইউনূসের ভুয়া ইমেজ একদম ধসে পড়বে।
ফেসবুকে পোস্টটি প্রকাশের পর নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ আইরিন খানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার কথা উল্লেখ করে তাকে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্বে দেখার পক্ষে মত দেন। আবার অনেকে বলেন, রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কে আসবেন, সে বিষয়ে জল্পনা-কল্পনার পরিবর্তে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করাই উচিত।
এদিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপি কাকে মনোনয়ন দেবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক মহলের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। শুরুতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানের নামও আলোচনায় উঠে এসেছে।
একাধিক সরকারি ও রাজনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ইতোমধ্যে আইরিন খানকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগেই তার নিউইয়র্কে দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতির কথাও জানা গেছে। তবে একই সময়ে রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম আলোচনায় আসায় নতুন কৌতূহল তৈরি হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন পেলে জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, আবার জাতিসংঘে দায়িত্ব গ্রহণ করলে রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাও কার্যত শেষ হয়ে যাবে। ফলে বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা বলেই মনে করা হচ্ছে।
সরকার ও বিএনপির ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে একজন নারীকে বিবেচনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং মানবাধিকার বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে আইরিন খানের নাম সামনে এসেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য। যদিও সরকার বা বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
আন্তর্জাতিক পরিসরে আইরিন খানের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। মানবাধিকার, শরণার্থী সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে তার কাজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গত দুই দশকে তার বক্তব্য ও বিশ্লেষণ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকলেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় না; শেষ পর্যন্ত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক সমীকরণই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
এদিকে বিএনপির অভ্যন্তরেও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি নিয়ে আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরে থেকে কাউকে আনার পরিবর্তে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা বেশি। আলোচনায় রয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের মতো নেতারা। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামের নামও আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে আইরিন খানকে ঘিরে আলোচনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর ফেসবুক পোস্টে উত্থাপিত দাবি ও অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখনো একাধিক সম্ভাব্য নাম আলোচনায় রয়েছে। ফলে কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি—সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন