ফাইল ছবি
দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে সম্ভাব্য দেশে ফেরার ঘোষণা, দলটির ওপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিষেধাজ্ঞা এবং ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
৫ অক্টোবর ভারতের সাময়িকী দ্য উইকে বৈশালী বসু শর্মার লেখা ‘হাসিনাস ডিসেম্বর রিটার্ন গ্যাম্বিট অ্যান্ড দ্য কনটেস্ট ফর বাংলাদেশস পলিটিক্যাল ফিউচার’ শিরোনামের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। এতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা, তার আইনি অবস্থান, ভারতের ভূমিকা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখাটির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা গেলেও তাকে কি স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা সম্ভব?
প্রশ্নটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক তর্ক নয়। শেখ হাসিনার নিজের বক্তব্যেই এর বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হতে পারে—এমন ঝুঁকির কথাও তিনি স্বীকার করেন। তবু দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তিনি অটল থাকার কথা জানান।
১ অক্টোবর লন্ডনে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্সের আয়োজিত সেমিনারে অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা একই অবস্থান আরও কঠোরভাবে তুলে ধরেন। দেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন এবং দেশের মানুষের জন্য মরতেও প্রস্তুত। ফলে ডিসেম্বরের ঘোষণা এখন শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের বিষয় নয়। এটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
তবে বাস্তবতা কঠিন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তার পাসপোর্ট বাতিল হয়েছে। ফলে দেশে ফেরার প্রশ্নটি রাজনৈতিক ইচ্ছার পাশাপাশি নথিপত্র, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। দ্য উইকের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রধান বাধা এখন রাজনৈতিক নয়, আইনি বাস্তবতা।
অন্যদিকে দেশের বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার অবস্থানে অনড়। ১ জুলাই তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ অন্য কোনো নাম বা ব্যানারেও রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞা অনির্দিষ্টকাল থাকবে কি না, সেটি আদালতের বিষয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এখানেই মূল প্রশ্ন। একটি দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা এবং দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি নিশ্চিহ্ন করা এক বিষয় নয়।
আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটি পূর্ব বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির নেতৃত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে লিখেছিলেন, ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তিনি লিখেছিলেন, পাকিস্তান আমলে বাঙালির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বে আওয়ামী লীগের মতো ভূমিকা অন্য কোনো দল দাবি করতে পারে না।
এই ঐতিহাসিক ভূমিকা দলটিকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখে না। বরং বর্তমান সংকটের আরেকটি দিকও কঠিনভাবে স্বীকার করতে হবে। মাহফুজ আনামই লিখেছেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তার বিশ্লেষণে দলটি ক্রমে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই দলের সর্বস্তরের সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের যে বিপর্যয়, তার পেছনে এই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দ্য উইকে ২০২৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনাম বলেছিলেন, ৭৫ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ পাকিস্তান আমল থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যায়ে দলটি জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে শুধু রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। একইভাবে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বলে গত দেড় দশকের শাসন নিয়ে ওঠা অভিযোগও অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং ঐতিহাসিক অবদান—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
আওয়ামী লীগের ইতিহাসেই তার টিকে থাকার আরেকটি বড় নজির রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দলটির ওপর নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। ৩ নভেম্বর কারাগারে চার জাতীয় নেতা হত্যার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বও কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়। মাহফুজ আনামের ভাষায়, তখন ক্ষমতাসীনরা ধরে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ বাস্তবে মৃত। কিন্তু দলটি বিলীন হয়নি। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে নেতৃত্ব নেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে।
বিশ্বেও এর নজির আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বা এএনসি ১৯৬০ সালে নিষিদ্ধ হয়। প্রায় ৩০ বছর পর ১৯৯০ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে দলটি ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ঐতিহাসিক সামাজিক ভিত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে দেয় না।
ভারতের অবস্থানও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। ৩ অক্টোবর ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে অবতরণের অনুমতি দেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে কার্যত অন্য কোনো পথ ছিল না। তাকে অবতরণের অনুমতি না দিলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতো বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এই বক্তব্য থেকে ভারতের অবস্থানের একটি দিক স্পষ্ট হয়। দিল্লি শেখ হাসিনার প্রশ্নটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সরাসরি অংশ হিসেবে না দেখিয়ে কূটনৈতিক ও আইনি বাস্তবতার মধ্যে রাখতে চাইছে। দ্য উইকের বিশ্লেষণেও ভারতের অবস্থানকে বাস্তববাদী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় নয়। এটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি বড় পরীক্ষা। শেখ হাসিনা ফিরলে বিচারিক প্রক্রিয়া সামনে আসবে। না ফিরলেও দলটির নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকবে।
সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তার বিচার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বিচার এবং একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব মুছে দেওয়া একই বিষয় নয়। আবার মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার ইতিহাসও কোনো দলকে জবাবদিহির বাইরে রাখতে পারে না।
দেশের সামনে এখন তাই আরও মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি একটি রাজনৈতিক দলের অপরাধের বিচার করবে, নাকি সেই দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বও নির্ধারণ করবে? এই দুইয়ের সীমারেখা অস্পষ্ট হলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে রাজনীতির বাইরে রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু দেশের ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতিতে দলটির যে গভীর শিকড়, তা কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে উপড়ে ফেলা সম্ভব কি না—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
খবরটি শেয়ার করুন