ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া আজ বৃহস্পতিবার চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়ার কথা। বিকেল তিনটায় ঢাকার ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে বাংলাদেশ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ১৫ বছরের রেয়াতি চুক্তি স্বাক্ষর হবে। একই চুক্তির আওতায় এনসিটির ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডও পরিচালনা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
চুক্তির অধীনে টার্মিনালের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নের দায়িত্ব নেবে। ১৫ বছর পর টার্মিনালটি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় পরিচালনার অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানও বন্দর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকছে।
চুক্তির আর্থিক দিকের কিছু তথ্যও এখন প্রকাশ্যে এসেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া জানিয়েছেন, ১৫ বছরে ডিপি ওয়ার্ল্ড মোট ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। এর মধ্যে প্রায় ৯ কোটি ডলার টার্মিনালের আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ব্যয় হবে। চুক্তির শুরুতে সরকারকে অগ্রিম হিসেবে আরও ৫ কোটি ডলার দেওয়ার কথা রয়েছে। বাকি অর্থও সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটি এনসিটি। ২০০৭ সালে নির্মিত এই টার্মিনালে পাঁচটি জেটি রয়েছে। বন্দরের তীরবর্তী ১৮টি গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই এনসিটিতে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট প্রায় ৩৫ লাখ একক কনটেইনার ওঠানামা হয়েছে। এর ৪০ শতাংশের বেশি এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। ফলে টার্মিনালটির ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন পুরো বন্দরের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
এনসিটি নির্মাণে বন্দর কর্তৃপক্ষের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছিল। টার্মিনালটি নির্মাণের পর দীর্ঘদিন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। তাদের চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সালের ৬ জুলাই শেষ হয়। পরদিন ৭ জুলাই থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এরপর কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলে। ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামোর আওতায় এনসিটির জন্য আন্তর্জাতিক বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেয়।
এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রক্রিয়াটি আরও এগোয়। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের পর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষি চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বন্দর শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ থেমে যায়। ৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে চুক্তি করা সম্ভব হবে না।
নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার আলোচনা শুরু হয়। ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্ল্যাটফর্মের বৈঠকে এনসিটি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মে মাসে ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির পাশাপাশি পাশের চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালকেও একীভূতভাবে পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বর্তমান চুক্তি এনসিটি ও এর ওভারফ্লো ইয়ার্ডকে ঘিরেই হচ্ছে।
চুক্তির পথে আইনি বাধাও তৈরি হয়েছিল। এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম উচ্চ আদালতে রিট করে। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টে বিভক্ত রায় হয়। পরে তৃতীয় বেঞ্চ ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি রিটের আবেদন খারিজ করে দেয়। বিষয়টি আপিল বিভাগে যায়। ১২ মার্চ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় এনসিটি পরিচালনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে ওই আইনি জটিলতা আর থাকেনি।
তবে চুক্তি নিয়ে শ্রমিক ও বন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের আপত্তি অব্যাহত রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানায়। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে চট্টগ্রামে মিছিল, সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি হয়। ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি থেকে আন্দোলনকারীরা চুক্তি হলে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মূল আপত্তির একটি হলো, নিজেদের অর্থে নির্মিত ও দীর্ঘদিন ধরে আয় করা একটি লাভজনক টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হবে। তাদের আশঙ্কা, চুক্তির ফলে বন্দরের আয় থেকে বড় অংশ বিদেশি অপারেটরের কাছে চলে যেতে পারে। গত জানুয়ারিতেও শ্রমিক নেতারা এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, বিদেশি অপারেটর এলে পরিচালন দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়তে পারে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত ১৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, আলোচনার ফল দেশের স্বার্থের অনুকূলে না হলে সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের পথও বিবেচনা করতে পারে।
চুক্তির কাঠামোতে বন্দরের আয় ভাগাভাগির ব্যবস্থাও রয়েছে। চুক্তির সারাংশ অনুযায়ী, প্রতি একক কনটেইনারের বিপরীতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি বা রাজস্ব দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই হার টার্মিনালের গড় আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। ট্রাকের ঘুরে আসার সময় ধাপে ধাপে ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনা এবং ক্রেনের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় তাই শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, চুক্তির শর্তে বন্দর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদে কতটা আর্থিক সুবিধা পাবে এবং পরিচালনার উন্নতি কতটা দৃশ্যমান হবে। বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, টার্মিনালে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি যুক্ত করার পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত সড়ক ও রেল অবকাঠামো উন্নত না হলে শুধু অপারেটর পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগের একটি অংশ এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নে যাওয়ার কথা। দ্রুত কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য নতুন স্ক্যানিং যন্ত্র বসানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যমান ক্রেন পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থায়ন করপোরেশন এই প্রকল্পে লেনদেনবিষয়ক পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে এরই মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ২০২৪ সালের জুন থেকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের উন্নয়ন ও পরিচালনার কাজে যুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডলগ ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনাও নিয়েছে।
ফলে আজকের এনসিটি চুক্তি শুধু একটি টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা বদলের ঘটনা নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন কাঠামোয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কতটা বাড়বে, স্থানীয় অপারেটরদের ভূমিকা কী থাকবে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে কীভাবে আয়, দক্ষতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রাখবে—এসব প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৫ বছরের চুক্তির বাস্তব ফল তাই নির্ভর করবে ঘোষিত বিনিয়োগ, পরিচালন লক্ষ্যমাত্রা, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন