ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
দেশের গণমাধ্যম জগতে চাকরি পরিবর্তন, কর্মপরিবেশ, বেতন–ভাতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো) যে ‘জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করেছে, তা এসব পুরোনো প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত থাকা অবস্থায় কিংবা চাকরি ছাড়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বা ছাড়পত্র ছাড়া অন্য কোনো টেলিভিশনে চাকরি নেওয়া যাবে না। অন্যথায় সেটিকে নিয়ম ভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
এ নির্দেশনা প্রকাশের পর সাংবাদিক মহলে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; বরং এটি সংবাদপেশার স্বাধীনতা ও শ্রম অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক সাংবাদিক এবং সাংবাদিক নেতার ভাষায়, এটি কার্যত “দাসত্বচুক্তি” তৈরির প্রচেষ্টা। কারণ চাকরি পরিবর্তনের অধিকার সীমিত করে দেওয়া মানে একজন কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা।
চাকরি পরিবর্তন আধুনিক শ্রমবাজারের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। কোনো ব্যক্তি যদি ভালো কর্মপরিবেশ, উন্নত বেতন, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র কিংবা পেশাগত উন্নতির সুযোগ পান, তাহলে তিনি কর্মস্থল পরিবর্তন করতে পারেন। এটি শুধু একজন কর্মীর অধিকার নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারেরও মৌলিক অংশ।
দেশে সরকারি চাকরি, করপোরেট খাত, ব্যাংক কিংবা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—সবখানেই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেখানে কর্মীকে চিরস্থায়ীভাবে আগের প্রতিষ্ঠানের অনুমতির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় না।
অ্যাটকোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন এখানেই। কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে যদি বকেয়া দায়িত্ব, চুক্তির শর্ত বা নির্দিষ্ট নোটিশ পিরিয়ড থাকে, তাহলে সেটি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হতে পারে। কিন্তু একটি সংগঠন যদি এমন বার্তা দেয় যে, অনাপত্তিপত্র ছাড়া অন্য কোথাও চাকরি নেওয়াই যাবে না, তাহলে তা ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা স্বাভাবিক।
এ কারণেই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) কঠোর ভাষায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, সাংবাদিকদের কর্মস্থল বেছে নেওয়ার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত এবং কোনো সংগঠন একতরফাভাবে সেটি খর্ব করতে পারে না। ডিআরইউর ভাষ্য অনুযায়ী, এমন নির্দেশনা সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক বিশেষজ্ঞও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রম আইনে কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কোনো কর্মী যদি চুক্তি ভঙ্গ করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠান আইনি পথ অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু চাকরি নেওয়ার মৌলিক অধিকারকে সীমিত করে দেওয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, এনওসি সাধারণত বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়—যেমন সরকারি চাকরি বা সংবেদনশীল নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট দায়িত্বে। বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে সেটিকে বাধ্যতামূলক করে তোলা একটি ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে। কারণ সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা যেখানে স্বাধীনতা শুধু সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেই নয়, কর্মপরিবেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা আরও একটি বিষয় সামনে আনছেন। দেশের অনেক টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানে বেতন বকেয়া থাকা, চুক্তি অনুযায়ী সুবিধা না পাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কিংবা চাকরির অনিশ্চয়তার অভিযোগ নতুন নয়। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাংবাদিকের হাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় থাকে অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগ। যদি সেই পথও সীমিত করে দেওয়া হয়, তাহলে কর্মীরা আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সাংবাদিকতার পেশা তখনই শক্তিশালী হয় যখন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকে। কারণ একজন সাংবাদিক যদি নিজের চাকরি নিয়েই সব সময় ভীত থাকেন, তাহলে তার পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি বড় প্রশ্ন হলো, অ্যাটকো কি আদৌ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে? অ্যাটকো মূলত টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন। এটি কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয় এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষও নয়। ফলে তাদের নির্দেশনা সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য হতে পারে, কিন্তু সেটি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার সীমিত করতে পারে কি না—তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কর্মী পরিবর্তন স্বাভাবিক বিষয়। বড় সংবাদমাধ্যমগুলো দক্ষ সাংবাদিক আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতা করে। এতে সংবাদপেশার মানও উন্নত হয়। কিন্তু যদি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের আটকে রাখার নীতি গ্রহণ করে, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের গুণগত মানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু মালিকপক্ষ হয়তো যুক্তি দিতে পারেন, দক্ষ কর্মী ধরে রাখা প্রয়োজন, কারণ প্রশিক্ষণে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। সেই যুক্তি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু দক্ষ কর্মী ধরে রাখার উপায় সাধারণত ভালো বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশ, পেশাগত নিরাপত্তা ও সম্মানজনক সংস্কৃতি তৈরি করা। বাধ্যবাধকতা বা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কর্মী ধরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না।
“দাসত্বচুক্তি” শব্দটি হয়তো আবেগপূর্ণ শোনাতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকদের একাংশের দৃষ্টিতে এর ব্যবহার একেবারে অমূলক নয়। কারণ দাসত্বের একটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তির স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করা। আধুনিক কর্মজগতে সেই চিত্র সরাসরি না থাকলেও, কোনো কর্মী যদি নিজের পেশাগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার হারান, তাহলে সেটি একই ধরনের নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের প্রশ্ন নয়। সেটি কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। একজন সাংবাদিকের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার অধিকার যেমন জরুরি, তেমনি তার স্বাধীনভাবে কর্মস্থল বেছে নেওয়ার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাটকোর এ সিদ্ধান্ত হয়তো প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সাংবাদিক সমাজ এটিকে কেবল একটি নিয়ম হিসেবে দেখছে না; তারা এটিকে পেশাগত স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে যে সমাজ কথা বলে, সেখানে সাংবাদিকদের চাকরির স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই আলোচনাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
গণমাধ্যম সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো)
খবরটি শেয়ার করুন