ছবি: বিবিসি
চীনা নববর্ষের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক সাধারণ আহ্বান মুহূর্তেই রূপ নিয়েছিল বিশাল জনসমাগম ও গ্রামীণ উৎসবে। ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের চংকিংয়ের হেচুয়ান অঞ্চলের চিংফু গ্রামে। ২০ বছর বয়সী এক তরুণী দাইদাই চীনা টিকটকে সহায়তার আবেদন জানান।
তিনি জানান, তার বাবা বয়সের কারণে ঐতিহ্যবাহী কমিউনিটি ভোজের জন্য নির্ধারিত দুটি শূকর জবাই করতে পারবেন না। বাবার কষ্ট লাঘব করতেই তিনি সামাজিক মাধ্যমে সাহায্য চান।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে দেওয়া ওই পোস্টে দাইদাই লেখেন, ‘কেউ কি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন? আমার বাবা খুব বৃদ্ধ। আমি আশঙ্কা করছি, তিনি এই শূকরগুলো সামলাতে পারবেন না।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, যারা গ্রামে এসে সহায়তা করবেন, তাদের সবাইকে শূকরের মাংসের ভোজ খাওয়ানো হবে।
চীনের সিচুয়ান ও চংকিংয়ের গ্রামীণ এলাকায় বড় আকারের কমিউনিটি ভোজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব ভোজে সাধারণত দুবার রান্না করা শূকরের মাংস, ভাপানো পাঁজর, স্যুপ ও ঘরে তৈরি মদ পরিবেশন করা হয়। দাইদাই তার পোস্টে বলেন, ‘আমি চাই আমাদের গ্রামে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।’
এই আহ্বান সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পোস্টটিতে এক মিলিয়নের বেশি লাইক পড়ে। বাস্তবে এর প্রতিফলন ঘটে চিংফু গ্রামে, যেখানে দাইদাইয়ের প্রত্যাশার তুলনায় বহু গুণ বেশি মানুষ উপস্থিত হন। হাজার হাজার গাড়ি গ্রামমুখী হওয়ায় গ্রামীণ চংকিংয়ের ওই এলাকায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়।
ড্রোনে তোলা ছবিতে দেখা যায়, দুই পাশে ধানখেত রেখে সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, সবাই চিংফু গ্রামে প্রবেশের অপেক্ষায়। যানজট এড়াতে কেউ কেউ দীর্ঘ পথ হেঁটে গ্রামে ঢোকার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে দাইদাই চালকদের সতর্ক থাকতে বলেন, বিশেষ করে শহর থেকে আসা চালকদের গ্রামীণ রাস্তার অবস্থার বিষয়ে সাবধান করেন।
১০০ কিলোমিটারের বেশি দূর থেকে গাড়ি চালিয়ে আসা এক ব্যক্তি বিবিসিকে বলেন, ‘পরিবেশটা দারুণ ছিল। এটা আমাকে আমার শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যখন আমাদের পরিবার শূকর পালন করত। বহু বছর পর এমন অনুভূতি পেলাম।’ তিনি জানান, তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নম্বরপ্লেট দেখেছেন।
পরে শূকর জবাই ও বিশাল ভোজের আয়োজন সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচার করা হয়। এই লাইভ অনুষ্ঠানটি এক লাখের বেশি মানুষ দেখেন এবং পরে এতে ২ কোটি লাইক পড়ে। স্থানীয় সরকার ঘটনাটিকে ‘ফ্ল্যাশ টুরিজম’ হিসেবে দেখছে এবং উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।
দুটি শূকরের মাংসে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাহিদা পূরণ সম্ভব না হওয়ায় স্থানীয় পর্যটন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত শূকর সরবরাহ করেন। পাশাপাশি ছোট ছোট স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলো খোলা জায়গায় বসার ব্যবস্থা করে আগত দর্শনার্থীদের খাবার পরিবেশন করে। দাইদাই চীনা গণমাধ্যমকে জানান, তিনি ধারণা করেছিলেন সর্বোচ্চ এক ডজন মানুষ আসতে পারেন। বাস্তবে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে তা গোনা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে চীনা সমাজে কমিউনিটি সংস্কৃতির প্রতি নতুন করে আকর্ষণ এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপ ও হতাশার মধ্যে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার খোঁজ। ঘটনার দ্রুত বিস্তারে দাইদাই নিজেও বিস্মিত হন। পোস্ট দেওয়ার পরদিনই মানুষের ঢল এত বেড়ে যায় যে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় তিনি পুলিশকে অবহিত করেন। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ভোজ ও উৎসব দুই দিন ধরে চলে। ১১ই জানুয়ারি যেখানে এক হাজার মানুষ খাবার খান, পরদিন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজারে। রাতে জ্বলে ওঠে অগ্নিকুণ্ড, চলে গান-বাজনা ও নাচ। একটি ব্যান্ডও অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। পরে দাইদাই একটি পোস্টে জানান, আয়োজন শেষ হয়েছে। তিনি নতুন দর্শনার্থীদের অঞ্চলটি ঘুরে দেখার আহ্বান জানালেও তার বাড়িতে আর না আসার অনুরোধ করেন। দুই দিনে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে তিনি জানান, তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত।
তবে তিনি বলেন, এটি তার এবং তার গ্রামের জন্য একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। যারা তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন, তাদের উদ্দেশে দাইদাই বলেন, ‘আপনাদের উদ্দীপনা ও আবেগ না থাকলে এমন একটি ভোজ সম্ভব হতো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা এসেছিলেন, সবার অনুভূতিই ছিল বড় একটি পরিবারের মতো। এটা ছিল উষ্ণ, আরোগ্যদায়ক ও অর্থবহ।’ একই সঙ্গে হঠাৎ এত বড় আয়োজন চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করায় তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে ধন্যবাদ জানান।
ইতিমধ্যে ধারণা করা হচ্ছে, দাইদাইয়ের গ্রাম ও হেচুয়ান অঞ্চলে ভবিষ্যতে এই আয়োজনকে নিয়মিত উৎসবে রূপ দিতে পারে। লক্ষ্য থাকবে তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন বাড়ানো।
চীনা সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলিকে এক গ্রামবাসী বলেন, ‘এখানে প্রতিবেশীরা একে অপরকে সাহায্য করে। আজ আমি তোমার বাড়িতে শূকর জবাই করতে সাহায্য করলাম, কাল তুমি আমার বাড়িতে এসে একই কাজ করবে।’
দাইদাই তার বাবার অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমার বাবা খুব খুশি। এত মানুষ আসতে দেখে তাকে অন্য গ্রামবাসীদের কাছ থেকে টেবিল ও চেয়ার ধার নিতে হয়েছে। আমরা আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতা পাইনি।’
খবরটি শেয়ার করুন