ছবি: সংগৃহীত
একই দিনে দুটি ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, দৈনিক কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘সিন্ডিকেটেড সংবাদ’ প্রকাশ করছে। জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “এখনো সময় আছে, ভেবেচিন্তে দেখতে পারেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনাদের অবস্থান পরিষ্কার করে আমাদের ও বাংলাদেশকে জানানো উচিত।”
এই দুটি ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; বরং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা গ্রহণের সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। রোববার (২৮ জুন) দেওয়া এক বিবৃতিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করেন, দলটির সুনাম ও ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন পরিকল্পিতভাবে ‘সিন্ডিকেটেড সংবাদ’ পরিবেশন করছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিবেদন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং যোগসাজশপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের সংবাদ প্রচার করে জামায়াতের অর্জিত সুনাম নষ্ট করা সম্ভব হবে না এবং জনগণ এসব অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবে না।
বিবৃতিতে জামায়াত নিজেদের একটি নিয়মতান্ত্রিক, সুশৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে। দলটি দাবি করে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের মানুষের পাশে থেকেছে এবং জাতীয় দুর্যোগ ও সংকটের সময় সহায়তার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করা নতুন কোনো ঘটনা নয়। গণতান্ত্রিক বিশ্বে প্রায় সব দলই কোনো না কোনো সময়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—পরিণত গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং তথ্যগত ভুল হলে তা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করার পথ অনুসরণ করে। আদালতে মানহানির মামলা, প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ বা প্রকাশ্যে তথ্য উপস্থাপনের মতো সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থাই সেখানে বেশি ব্যবহৃত হয়।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডা, বা অস্ট্রেলিয়ার মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম প্রায় প্রতিদিনই সরকার ও বিরোধী দল—উভয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অনেক সময় এসব প্রতিবেদন রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়, কিন্তু সেটিই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির একটি স্বীকৃত অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করা রাজনৈতিক দলের অধিকার হলেও, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা বা সাংবাদিকদের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য উদ্বেগের বিষয় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখ করে আসছে।
দেশের বাস্তবতাও ভিন্ন নয়। দেশের সংবাদমাধ্যম বহুবার সরকার, বিরোধী দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বিচারব্যবস্থা ও অন্যান্য ক্ষমতাকেন্দ্র নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনের কিছু পরবর্তীতে সংশোধিত হয়েছে, কিছু আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে, আবার অনেকগুলোর ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় তদন্তও হয়েছে। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে মতবিরোধ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; তবে সেই মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি ও আইনের মাধ্যমে।
তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের পেশাগত দায়বদ্ধতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের উৎস যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট তুলে ধরা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির অংশ।
একইভাবে কোনো প্রতিবেদনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা অসত্য দাবি করলে সেই অভিযোগের পক্ষেও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। এতে জনসাধারণের সামনে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা সহজ হয় এবং অযথা বিভ্রান্তি কমে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক সব সময় একমুখী হয় না। কখনো সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায়, আবার কখনো বিরোধী দলগুলোর বক্তব্য ও অভিযোগও জনসমক্ষে তুলে ধরে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও তা যেন ব্যক্তি আক্রমণ বা অবিশ্বাসের সংকটে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা এবং তথ্যভিত্তিক জনআলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা।
জামায়াতের এই অভিযোগ ঘিরে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একটি রাজনৈতিক দল যদি মনে করে কোনো সংবাদমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করছে, তাহলে সেই অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে? আবার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের অধিকার কোথায় শেষ হয়, আর রাজনৈতিক প্রচারণা কোথা থেকে শুরু হয়—সেই বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দলটির অবস্থানও আবার আলোচনায় উঠে এসেছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময় দলটির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালানো হয়েছে এবং অনেক অভিযোগ পক্ষপাতদুষ্ট।
পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবার জন্যই তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের অভিযোগ বা পাল্টা অভিযোগ যাচাইযোগ্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হলে জনমনে বিভ্রান্তি কমে এবং গণতান্ত্রিক বিতর্ক আরও শক্তিশালী হয়।
এদিকে কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
খবরটি শেয়ার করুন