সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমাদের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ভূমিকা আমাকে কিছুটা হতাশ করেছে। বেসরকারি অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল বা সংবাদপত্র একই ধরনের অগভীর সংবাদ পরিবেশন করছে। আমাদের দেশে নির্বাচনের সময় জরিপ করার মতো প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞা বা বিদ্যা এখনো গড়ে ওঠেনি। সংবাদ মাধ্যমগুলো শুধু জনসভা আর প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠনের পর দেশের সামনে কী কী জাতীয় চ্যালেঞ্জ আসবে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কী হবে, এ নিয়ে গভীর কোনো বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্টিং চোখে পড়ছে না। এর একটি প্রধান কারণ হলো আমাদের সংবাদকর্মীদের পড়াশোনার অভাব।
তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা সারাদিন মাঠে কাজ করেন, তাদের ওপর কাজের চাপ অনেক বেশি, ফলে পড়াশোনা করে গভীর কোনো ধারণা পাওয়ার সুযোগ তারা পান না। এ কারণেই আমাদের সাংবাদিকতা গৎবাঁধা থেকে যাচ্ছে। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে লেখা এক বিশেষ নিবন্ধে শাহদীন মালিক এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ রোববার (১লা ফেব্রুয়ারি) যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে ‘নির্বাচন, সংস্কার ও আগামীর বাংলাদেশ’ শিরোনামে।
যুগান্তরের ওয়েবসাইট থেকে নিবন্ধটির লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে শাহদীন মালিকের বক্তব্য নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনা চলছে।
শাহদীন মালিক লেখেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, দৃশ্যমান বড় কোনো পরিবর্তন এখনো হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের একটি বড় কৃতিত্ব হলো বাক-স্বাধীনতা। আমরা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম নিয়ে নির্ভয়ে তার সমালোচনা করতে পারছি, যা বিগত সরকারের সময় কল্পনাও করা যেত না। আমি আশা করি, পরবর্তী সরকার যেন এ পরিবেশটি বজায় রাখে।
তিনি বলেন, এর বাইরে ব্যাংকিং খাতে কিছু সংস্কার এবং বিচারপতি নিয়োগের আইন হওয়ার মতো কিছু কাজ হয়েছে। তবে প্রশাসনের ক্ষেত্রে, যারা ১০-১৫ বছর আগে অবসরে গেছেন বা পদোন্নতি পাননি, তাদের ফিরিয়ে আনা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার ফলে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডে সমস্যা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকা এ কর্মকর্তাদের দিয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন করা কঠিন।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। কারণ দেশের মানুষ এখন একটি ভালো নির্বাচন চায়। জনগণ যদি ভোটকেন্দ্রে সজাগ থাকে, তবে প্রশাসনের স্তরে কোনো গাফিলতি বা কারচুপির সুযোগ কেউ নিতে পারবে না। সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের সচেতনতাই একটি অবাধ নির্বাচনের গ্যারান্টি। নির্বাচন কমিশনকেও এ জনআকাঙ্ক্ষা ধারণ করে কাজ করতে হবে।
তার মতে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতি। আমাদের জ্বালানি খাতে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এটি আমাদের মোট শিক্ষা বাজেটের সমান। বিগত সরকারের করা অতিরঞ্জিত দামের বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো চাইলেই বাতিল করা যাবে না। এ বিপুল অর্থের জোগান দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ট্যাক্স বা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ আসবে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও হবে বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে যে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা থেকে সমাজকে বের করে আনা পরবর্তী সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে। মানুষকে আইনের শাসনের প্রতি আস্থাশীল করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাদের মধ্যে ন্যূনতম ঐক্য থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় সংস্কারের মতো বিষয়গুলো কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং পুরো জাতির। দলগুলো যদি সহযোগিতা না করে, তবে শুধু সরকারের পক্ষে এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
খবরটি শেয়ার করুন