ফাইল ছবি
বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন আবারও দেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। দুটি আসনেই বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করলেও নির্বাচন ঘিরে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং আস্থার সংকট নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামালের মন্তব্য এ বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। দুটি আসনেই বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এ নির্বাচনের সমালোচনা করে মাসুদ কামাল বলছেন, ‘১৯৯১ সালে যে নির্বাচনটা হয়েছিল সে নির্বাচনে কিন্তু বিএনপি জিতেছিল এবং সেই নির্বাচনটা সুষ্ঠু নির্বাচন ছিল। বিচারপতি আব্দুর রউফ খুব ভালো নির্বাচন করেছিলেন।
কিন্তু মাগুরার একটা উপনির্বাচন ভালো করতে পারেননি বরং সেখান থেকে পালিয়ে চলে এসেছিলেন। তখনও বিএনপি সরকারে ছিল। এখান থেকে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে সেটা হলো যে দলীয় সরকারের অধীনে কখনো একটা ভালো নির্বাচন হয় না, আমাদের দেশে সেই নির্বাচন কমিশন যত শক্তিশালী হোক না কেনো ম্যাটার করে না। সরকার যদি কোনো রাজনৈতিক দলীয় সরকার হয় তাহলে সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন ভালো হয় না।’
‘কথা’ নামক ইউটিউব চ্যানেলে এক ভিডিওতে মাসুদ কামাল এসব কথা বলেন। তার এই বক্তব্য নতুন নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে সাধারণভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে দেখা হলেও পরবর্তী সময়গুলোতে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বেড়েছে। বিশেষ করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে প্রশাসনিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার নজির বহুবার দেখা গেছে।
মাসুদ কামাল বলেন, ‘তারেক রহমানের যে বিএনপি সরকার সেই সরকারের অধীনে এটা হলো প্রথম নির্বাচন। এ নির্বাচনটা কি অভিযোগবিহীনভাবে হতে পেরেছে? এটা নিয়ে কিন্তু বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। বগুড়া-৬ নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ খুব জোরালো কোনো অভিযোগ এসেছে বলে আমি দেখিনি।
কিন্তু শেরপুর তিন আসনে জামায়াত প্রার্থী নিজেই একটা প্রেস কনফারেন্স করেছেন এবং সে প্রেস কনফারেন্সে ব্যালটে আগে থেকে স্বাক্ষরসহ বেশ কয়েকটা অভিযোগ তুলে ধরেছেন। দুইটা আসনের কোনো কেন্দ্রে ভিড় ছিল না, যে আগে ভাগে সিগনেচার না করে রাখলে ভোট দেওয়া যেত না, কাজেই এটা একটা অন্যায় হয়েছে। জামাতের যিনি পুলিং এজেন্ট আছে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে ও মারধর করা হয়েছে। সব খুঁটিনাটি বিষয় প্রকাশ করে নির্বাচন বর্জন করেছেনে।’
এই বক্তব্যে যে চিত্র উঠে আসে, তা কেবল একটি নির্বাচনের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকা, ব্যালটে আগাম স্বাক্ষরের অভিযোগ, বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া—এসব অভিযোগ অতীতেও বহু নির্বাচনে শোনা গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতাগুলো কি আদৌ দূর করা গেছে?
তিনি বলেন, ‘বর্জনের মতো ঘটনাটা ঘটলো কেন। একটা নির্বাচন করবেন ঠিকঠাক মতো কেন করতে পারলেন না। নির্বাচন কমিশন বলেছে আন্তর্জাতিকভাবে নির্বাচন তারা করতে চান।’
এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব তাদের হলেও বাস্তবে কতটা স্বাধীনভাবে তারা কাজ করতে পারছে—এই প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যদি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, তাহলে সেই ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।
বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি সতর্ক ছিল না। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপি যদি তার দলের শেরপুরে যারা দলের নেতাকর্মী আছেন তাদের উনারা যদি সতর্ক করে দিতেন আগেভাগে যে আমরা কোনো ধরনের অভিযোগ শুনতে চাই না। জনগণ যে ভোটটা দেবে সেটাই হবে। তাহলে কিন্তু এই দৃশ্যগুলো আমাদের দেখতে হতো না।’
এ বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে—শুধু নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসন নয়, ক্ষমতাসীন দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ, আচরণবিধি মেনে চলা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতি সহনশীলতা—এসবই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।
মাসুদ কামাল বলেন, ‘আমাদের দেশের আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগ ছিল। কিন্তু আমার বিবেচনার সবচেয়ে বড় অভিযোগটা ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাটাকে নষ্ট করে দিয়েছিল এবং সেই ঘটনার পুনারাবৃত্তি আমরা চাই না কিন্তু সেই ঘটনার সূচনা হয়ে গেছে।’
এই মন্তব্যে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র টানা হয়েছে। অর্থাৎ, যে অভিযোগ একসময় একটি সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছিল, এখন সেই একই ধরনের অভিযোগ নতুন সরকারের ক্ষেত্রেও শোনা যাচ্ছে—এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থার মূল সংকটটি আস্থার সংকট। ভোটাররা যদি বিশ্বাস না করেন যে তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হবে, তাহলে নির্বাচনের অংশগ্রহণ কমে যায়, গণতান্ত্রিক বৈধতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইনি কাঠামো নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে—দলীয় সরকারের অধীনে আদৌ কি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব? মাসুদ কামালের মন্তব্য হয়তো চূড়ান্ত সত্য নয়, কিন্তু তা একটি গভীর বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি।
খবরটি শেয়ার করুন