ফাইল ছবি
দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। আদালতের নির্দেশনায় দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য দেশের গণমাধ্যমে প্রচারে বিধিনিষেধ রয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানও সাংবাদিকদের প্রতি শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে অনেকের ধারণা ছিল, দেশের ভেতরে তার রাজনৈতিক উপস্থিতি যেমন কমে যাবে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আগ্রহ দ্রুত হ্রাস পাবে।
কিন্তু গত প্রায় দুই বছরের আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ভিডিও বার্তা বা সাক্ষাৎকার এখনও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। বরং দেশের ভেতরে তার বক্তব্য প্রচারে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার পর বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদন বাংলাদেশের পাঠকদের কাছেও আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকেই এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল ও টেলিভিশন চ্যানেলের খবর নিয়মিত অনুসরণ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া শেখ হাসিনার বিশেষ সাক্ষাৎকার। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, চলতি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে তার। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিকভাবে দলটিকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ উদ্ধৃত করে নিজস্ব প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরে সেটি বিশ্বের বহু সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে শেখ হাসিনার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে স্থান পেয়েছে। তার ভিডিও বার্তা, বিবৃতি বা সাক্ষাৎকার আন্তর্জাতিক সংবাদমূল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই সময়ে তার ছেলে ও সাবেক আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও বিবিসি, আল জাজিরা, রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আওয়ামী লীগের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে জয়ের চেয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির পরিচিত মুখ।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, শেখ হাসিনা প্রায় দুই দশক বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকট, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে ক্ষমতার বাইরে গেলেও তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমূল্য হারায়নি।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, বিচারিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় দলটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা সহজ নয়। ফলে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক সংবাদে স্থান পাচ্ছে।
তৃতীয়ত, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থান, বঙ্গোপসাগর, বৈশ্বিক পোশাকশিল্প, ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোর কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কাছে এখনও বড় সংবাদ।
তবে একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ করলেও সেটিকে পুরোপুরি সমর্থন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সেসব প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান, মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনা বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও সমানভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সব গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
আবার দেশের ভেতরে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় একটি নতুন বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে। দেশের অনেক পাঠক এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সংবাদমাধ্যমগুলো শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার, বিবৃতি এবং আওয়ামী লীগ-সংক্রান্ত রাজনৈতিক ঘটনাগুলো তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। ফলে বাংলাদেশের একটি অংশের পাঠক ও দর্শক সেসব মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন। ডিজিটাল যুগে সীমান্ত পেরিয়ে সংবাদ প্রবাহের এই বাস্তবতা তথ্যপ্রবাহের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর কাজের ধরনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, একই বক্তব্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ মানেই আলাদা আলাদা সাক্ষাৎকার। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।
ধরা যাক, এনডিটিভি শেখ হাসিনার একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নিল। পরে রয়টার্স সেই সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উদ্ধৃত করে নিজস্ব সংবাদ তৈরি করল। রয়টার্সের গ্রাহক হিসেবে বিশ্বের শত শত সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন পোর্টাল সেই প্রতিবেদন ব্যবহার করতে পারে। ফলে একটি সাক্ষাৎকার অল্প সময়েই বৈশ্বিক সংবাদে পরিণত হয়। একইভাবে এএফপি, এপি বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিন্ডিকেশন ব্যবস্থা রয়েছে।
রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি পরিচিত রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলও। যখন কোনো রাজনৈতিক দলের দেশের ভেতরে প্রচারের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, তখন তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজেদের বক্তব্য বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত বা ক্ষমতাচ্যুত বহু রাজনৈতিক নেতাও অতীতে একই কৌশল অনুসরণ করেছেন। তবে কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কোনো বক্তব্য প্রকাশ করলেই সেটিকে সেই বক্তব্যের প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। সংবাদমূল্য থাকলেই সেটি প্রকাশ করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর সজীব ওয়াজেদ জয় প্রথম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আওয়ামী লীগের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। পরে তিনি বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা, নির্বাচন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ বক্তব্য বা সাক্ষাৎকারই বেশি আলোচিত হয়েছে এবং সেগুলোই তুলনামূলক বেশি উদ্ধৃত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে শেখ হাসিনা এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ কারণেই তাকে ঘিরে সংবাদমূল্য এখনও বজায় রয়েছে।
তবে এটিও সমানভাবে সত্য যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বেশি কভারেজ পাওয়া মানেই কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন নয়। আবার এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কোনো অভিন্ন অবস্থান রয়েছে বা তারা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাদের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি অনুসারে তথ্য, বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করছে।
দেশের রাজনীতি যেদিকেই এগোক না কেন, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ আপাতত অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর কারণ কেবল তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন নয়; বরং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের সংবাদ নির্বাচন প্রক্রিয়াও এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
খবরটি শেয়ার করুন