সোমবার, ১২ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** মূল ফটক ও প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে চেয়ারে বসলেন চুয়েটের নতুন ভিসি, সঙ্গে বহিরাগত *** বিএনপির নেতাকর্মীদের ফ্যাসিবাদী আচরণ না করার আহ্বান রিজভীর *** ইউপি নির্বাচন ৫ ধাপে, প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ ২১ জানুয়ারি *** ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আসলে কেমন ছিল *** রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা প্রসঙ্গে মৌলবাদীদের অপপ্রচারের ভিত্তি কী *** সৌদি বিমানবন্দরে হামলা: বাংলাদেশের প্রবাসী আয়, শ্রমবাজার ও ওমরাহ পালনে কতটা ঝুঁকি *** যুবরাজের ভুল হিসাব, যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত সমর্থন: ইয়েমেন যুদ্ধে আবার কেন জড়াল সৌদি আরব *** রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের দ্বিতীয় হামলায় নিহত ১, আহত ১১ *** প্রবাসীর স্ত্রীকে গাছে বেঁধে মারধর, চুল কেটে পাঠানো হলো বাবার বাড়ি *** বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে: ধ্রুব রাঠি

রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা প্রসঙ্গে মৌলবাদীদের অপপ্রচারের ভিত্তি কী

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১২:৪০ অপরাহ্ন, ১২ই অক্টোবর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এমন একটি দাবি দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বক্তব্য, সভা-সমাবেশ ও লেখালেখির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়েছে এই অভিযোগ। তবে ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় আয়োজিত একটি সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন বলে যে দাবি করা হয়, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বরং ওই দিন কবি শিলাইদহে ছিলেন বলে তার চিঠিপত্র ও জীবনীভিত্তিক গবেষণায় তথ্য রয়েছে। ইতিহাসবিদ ও রবীন্দ্রগবেষকেরা এ কারণে অভিযোগটির সত্যতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনাটি পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। ১০ অক্টোবর গ্রাফিতি বিকৃত করার অভিযোগে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসসহ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় চারজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছিল। পরে সেই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথিত বিরোধিতার অভিযোগটি যাচাই করতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৯১২ সালে। ওই বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে এসে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অসন্তোষ প্রশমনের বিষয়টিও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক দেখা দেয়। কলকাতার কিছু শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক নেতা এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব ও বরাদ্দ কমতে পারে। আবার পূর্ব বাংলার কিছু মানুষ মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসারে বেশি অর্থ ব্যয় করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বাস্তবেই হয়েছিল। কিন্তু সেই বিরোধিতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে যুক্ত করার দাবিটি আলাদা করে যাচাই করা জরুরি। কারণ, কোনো একটি সভায় অন্য ব্যক্তিরা বিরোধিতা করেছিলেন বলেই সেখানে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন বা সভাপতিত্ব করেছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

২০০০ সালে প্রকাশিত মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের একটি বইয়ে দাবি করা হয়, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে একটি জনসভা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই বক্তব্য বিভিন্ন লেখা ও আলোচনায় ব্যবহৃত হয়। তবে এ দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সূত্র উপস্থাপন করা হয়নি বলে গবেষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন।

গবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় তার নিজের লেখা চিঠি ও রচনার তারিখ থেকে। ১৯১২ সালের মার্চ মাসে অসুস্থতার কারণে তার ইংল্যান্ডযাত্রা স্থগিত হয়। এরপর তিনি শিলাইদহে অবস্থান করেন।

২৮ মার্চও তিনি সেখানে ছিলেন বলে তার চিঠিপত্রের তথ্য উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। ওই দিন শিলাইদহ থেকে লেখা তার চিঠির তথ্যও বিভিন্ন গবেষণায় উদ্ধৃত হয়েছে। ফলে কলকাতার গড়ের মাঠের সভায় তার উপস্থিতি নিয়ে যে দাবি প্রচারিত হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে মেলে না।

প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক লেখাতেও ১৯১২ সালের মার্চে কবির শিলাইদহে অবস্থানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ ওই সময় কলকাতায় ছিলেন না। তার রচনার তারিখ, চিঠিপত্র ও জীবনীভিত্তিক তথ্য এ অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি আলোচনা সভায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার অভিযোগের ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেছিলেন।

গবেষকেরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সম্পর্কও এ বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২৬ সালে তিনি ঢাকা সফর করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে সংবর্ধনা গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার এই সম্পর্কের তথ্যও গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে পরবর্তী সময়ে সংবর্ধনা গ্রহণ করাই ১৯১২ সালে তার অবস্থান নির্ধারণের একমাত্র প্রমাণ নয়। সে সময়ের চিঠিপত্র, রচনার তারিখ ও অন্যান্য ঐতিহাসিক নথিই এ বিষয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিরোধিতা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। পাকিস্তান আমলে তার সাহিত্য ও সংগীতকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্যোগে বাঙালির ভাষা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিয়ে টানাপোড়েন দেখা দেয়। রবীন্দ্রনাথকে অনেক সময় ভারতীয় বা হিন্দু সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তার গান সরকারি বেতারে প্রচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসন চলছিল। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও কবির জন্মশতবার্ষিকী পালনে সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা উদ্যোগ নেন। সুফিয়া কামালসহ বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বেরা এসব আয়োজনে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার সরকারি বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচারের ওপর লিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

স্বাধীনতার পরও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। তার ভাস্কর্য, গান, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি ও প্রতিবাদ দেখা গেছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার অভিযোগের মতো একটি বিতর্কিত দাবিকে যাচাই ছাড়াই বারবার প্রচার করা হলে তা ইতিহাস সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরির সুযোগ করে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে পুরোনো বক্তব্য এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফেসবুকের পোস্ট, ভিডিও ও বিভিন্ন অনলাইন আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এমন দাবি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু এসব পোস্টে অনেক সময় মূল সূত্র, সমসাময়িক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বা প্রামাণ্য দলিলের উল্লেখ থাকে না। কোনো দাবি বহুবার প্রচারিত হলেই তা ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত হয় না।

রবীন্দ্রগবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এ ধরনের বিতর্ক যাচাই করতে হলে মূল নথি, চিঠিপত্র, সমসাময়িক সংবাদপত্র এবং নির্ভরযোগ্য জীবনীগ্রন্থের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন এমন ব্যক্তিদের নাম ও তাদের বক্তব্যের ঐতিহাসিক প্রমাণ থাকলে তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু সেই বিরোধিতার দায় প্রমাণ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের ওপর চাপানো ইতিহাসচর্চার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাকে নিয়ে সমালোচনা বা সাহিত্যিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রচার করার আগে তার প্রমাণ থাকা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে প্রচারিত দাবির ক্ষেত্রেও সেই প্রমাণের প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

মূল ফটক ও প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে চেয়ারে বসলেন চুয়েটের নতুন ভিসি, সঙ্গে বহিরাগত

🕒 প্রকাশ: ০২:০৪ অপরাহ্ন, ১২ই অক্টোবর ২০২৬

বিএনপির নেতাকর্মীদের ফ্যাসিবাদী আচরণ না করার আহ্বান রিজভীর

🕒 প্রকাশ: ০১:৫৮ অপরাহ্ন, ১২ই অক্টোবর ২০২৬

ইউপি নির্বাচন ৫ ধাপে, প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ ২১ জানুয়ারি

🕒 প্রকাশ: ০১:৫৪ অপরাহ্ন, ১২ই অক্টোবর ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আসলে কেমন ছিল

🕒 প্রকাশ: ০১:০৪ অপরাহ্ন, ১২ই অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা প্রসঙ্গে মৌলবাদীদের অপপ্রচারের ভিত্তি কী

🕒 প্রকাশ: ১২:৪০ অপরাহ্ন, ১২ই অক্টোবর ২০২৬

Footer Up 970x250