ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে একের পর এক হামলা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে না, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে প্রবাসী শ্রমিক, তাদের পাঠানো অর্থ, আকাশপথে যাতায়াত এবং ওমরাহ পালন। এসব ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেশি। ফলে দেশটির বিমান চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে তার প্রভাব একাধিক খাতে পড়তে পারে।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ওই হামলায় সৌদি আরবের চার নাগরিকের পাশাপাশি বাংলাদেশের দুই নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। রয়টার্সের ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের দিনের হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন।
এরপর রোববার, ১১ অক্টোবর রিয়াদের একই বিমানবন্দরে আবারও হামলা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, বিমানবন্দরের চার নম্বর টার্মিনালে একটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানলে আগুন ধরে যায়। এতে একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন। বিমানবন্দরের আশপাশে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথাও জানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। অর্থাৎ, আগের দিনের প্রাণঘাতী হামলার পরও বিমানবন্দরের নিরাপত্তাঝুঁকি কাটেনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা হয়। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের কথা জানায়। বিমানবন্দরের কাছে উড়োজাহাজের পাশে একটি বস্তু আঘাত হানার পর আগুন দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স। গার্ডিয়ানও দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার খবর প্রকাশ করেছে। ফলে নিরাপত্তার উদ্বেগ আর শুধু রাজধানী রিয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে আকাশপথের যোগাযোগে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস রিয়াদ বিমানবন্দরে কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে ঢাকা–রিয়াদ–ঢাকা রুটের বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইটেও ১১ অক্টোবরের বিজি৩৩৯ ফ্লাইট স্থগিতের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
বাসস জানায়, রিয়াদের বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ঢাকা ও রিয়াদের মধ্যে চলাচলকারী পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ছাড়াও সৌদিয়া ও রিয়াদ এয়ারের ফ্লাইট ছিল। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ সময় ১২ অক্টোবর রাত তিনটা পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকার কথা ছিল। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, একটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বাংলাদেশের একাধিক বিমান সংস্থার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিমান চলাচলে বিঘ্নের প্রভাব শুধু টিকিট কাটা যাত্রীদের ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রম অভিবাসনের গন্তব্য। সেখানে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে সৌদি আরব থেকে আসা অর্থ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিমানবন্দরে হামলার কারণে ফ্লাইট বাতিল হলেই রেমিট্যান্স কমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে পারেন। কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমিকদের যাতায়াত, নতুন কর্মী পাঠানো, ছুটিতে দেশে আসা এবং কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এর সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়া ও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাবও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবে যাওয়ার আগে অনেকে নিয়োগসংক্রান্ত খরচ, যাতায়াত এবং প্রাথমিক আবাসনের জন্য অর্থ ব্যয় করেন। ফ্লাইট বাতিল হলে বা যাত্রা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পিছিয়ে গেলে তাদের বাড়তি খরচ বহন করতে হয়। যারা ছুটির পর কাজে ফিরছেন, তাদের ক্ষেত্রেও নিয়োগকর্তার নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ার খবরের সঙ্গে যাত্রীদের জন্য কার্যকর তথ্য ও সহায়তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হজ ও ওমরাহ। জেদ্দা ও মদিনা হজযাত্রী এবং ওমরাহ পালনকারীদের যাতায়াতের প্রধান প্রবেশপথগুলোর মধ্যে রয়েছে। রিয়াদ ও দাম্মামে হামলার ঘটনা সরাসরি জেদ্দা বা মদিনার সব ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়। তবে একাধিক বিমানবন্দরে হামলা এবং সৌদি আকাশসীমা নিয়ে সতর্কতা বাড়লে বিমান সংস্থাগুলোকে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা, উড্ডয়নপথ ও সময়সূচি নতুন করে মূল্যায়ন করতে হতে পারে।
এ কারণে ওমরাহযাত্রীদের জন্যও পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লাইটের সময় পরিবর্তন, সংযোগকারী ফ্লাইটে সমস্যা কিংবা বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণের প্রয়োজন হলে যাত্রীদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ ও দলগতভাবে ভ্রমণকারী যাত্রীদের জন্য আগাম সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সৌদি আরবের আকাশপথ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সতর্কতা বেড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দেশটিতে এবং দেশটির ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। সৌদি আরবে যুক্তরাজ্যের দূতাবাসও জেদ্দা ও দাম্মামসহ কয়েকটি এলাকায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করার জন্য বিমান সংস্থা, কর্মী ও যাত্রীদের সতর্ক করেছেন। তবে এসব সতর্কতা মানেই সৌদি আরবের সব বিমানবন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে, এমন নয়।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতির আরেকটি তাৎপর্য হলো, আকাশপথে চলাচলের বিকল্প পরিকল্পনা কতটা প্রস্তুত আছে। কোনো বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ হলে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করা সম্ভব কি না, বিকল্প পথ ব্যবহারে কতটা অতিরিক্ত সময় লাগবে এবং যাত্রীদের কোথায় রাখা হবে—এসব বিষয়ে বিমান সংস্থার প্রস্তুতি থাকা দরকার। একই সঙ্গে উড়োজাহাজের জ্বালানি, ক্রুদের কর্মঘণ্টা, পরবর্তী ফ্লাইটের সময়সূচি ও যাত্রীদের লাগেজ ব্যবস্থাপনাও বিবেচনায় নিতে হয়।
ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন বা উড্ডয়ন বাতিলের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আবহাওয়া, কারিগরি সমস্যা, আকাশসীমার বিধিনিষেধ কিংবা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সবই সম্ভাব্য কারণ। তাই কোনো নির্দিষ্ট ফ্লাইট দেরি করেছে বা অন্য বিমানবন্দরে নেমেছে বলেই সেটিকে হামলার সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না। প্রতিটি ঘটনার কারণ সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মধ্যে সমন্বয় এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিয়মিত নিরাপত্তা-তথ্য সংগ্রহ, বাতিল ফ্লাইটের যাত্রীদের দ্রুত অবহিত করা এবং বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটের মাধ্যমে প্রবাসী ও যাত্রীদের সহায়তা জোরদার করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে নতুন কর্মীদের যাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা দরকার। যারা ইতিমধ্যে ভিসা পেয়েছেন বা যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছেন, তাদের যেন অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়া জরুরি।
রিয়াদ ও দাম্মামের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ধারাবাহিকতা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। এর সঙ্গে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘাতও জড়িত। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিরা রিয়াদ ও দাম্মামের বিমানবন্দরে হামলার দাবি করেছে। তবে প্রতিটি ঘটনার দায় ও বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা তথ্যের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, সৌদি আরবের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও জনশক্তি-সম্পর্কিত যোগাযোগ বজায় রেখেও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে। কিন্তু হামলা অব্যাহত থাকলে যাত্রীসেবা, শ্রম অভিবাসন ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হবে। তাই শুধু ফ্লাইট বাতিলের তাৎক্ষণিক সমস্যা সামলানো নয়, দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
খবরটি শেয়ার করুন