কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশ ঘরের সামনে পিন্টু মিয়ার স্বজনদের অপেক্ষা। ছবি: সংগৃহীত
একটি যাত্রা, একটি দুর্ঘটনা—আর সেই দুর্ঘটনা কেড়ে নিল জীবনের সবকিছু। ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টু মিয়া এখন বেঁচে আছেন, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষের ঘটনায় স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন তিনি।
ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মানিকদীতে বসবাস করেন পিন্টু মিয়া। পেশায় তিনি একজন বাসচালক। ঈদের ছুটি কাটাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাটানো সেই ঈদই যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শোক হয়ে ফিরে আসবে—তা কল্পনাও করেননি তিনি। যে মামুন স্পেশাল পরিবহনের বাস তিনি চালান, সেই বাসই যে তার স্ত্রী, সন্তানদের প্রাণ কেড়ে নেবে তা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি।
ঈদের দিন বিকেলে সিদ্ধান্ত হয়, স্ত্রী লাইজু আক্তার এবং দুই মেয়ে—ছয় বছরের খাদিজা আক্তার ও সাড়ে তিন বছরের মরিয়ম আক্তারকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরের হাজিরহাটে পাঠাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা ঝিনাইদহের মহেশপুর থেকে মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। কিন্তু পিন্টু নিজে সেই বাসে থাকেননি।
কারণ, সৌদি আরব থেকে আসছিলেন তার শ্যালক। তাকে আনতে ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাই স্ত্রী-সন্তানদের বাসে তুলে দিয়ে নিজে ঢাকায় নেমে যান। সেই নামাটাই যেন হয়ে দাঁড়ায় জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা।
পিন্টু মিয়া বলেন, ‘আমি যে বাস চালাই, সেই “মামুন স্পেশাল” পরিবহনেই আমার স্ত্রী-সন্তানদের তুলে দিলাম। সহকর্মী চালকের কাছে তাদের দায়িত্ব দিয়ে নিজে ঢাকায় নেমে গেলাম। তখন ভাবিনি এটাই শেষ দেখা।’
পিন্টু মিয়া নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন সহকর্মীর সঙ্গে। জানতে চাইছিলেন স্ত্রী-সন্তানদের খবর। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার পর হঠাৎই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ‘রাত ৩টার পর থেকে আর কোনো যোগাযোগ পাইনি। ফোন বন্ধ। বারবার চেষ্টা করেও পাইনি। এরপর আসে সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনার খবর’ কাঁপা কণ্ঠে বলেন তিনি।
গতকাল দিবাগত রাত ৩টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার জাঙ্গালিয়া এলাকার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচে ট্রেন-বাস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঢাকাগামী ‘চট্টগ্রাম মেইল’ ট্রেনের সঙ্গে নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বাসটি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১২ জন। এই নিহতদের মধ্যে তিনজন হলেন পিন্টু মিয়ার স্ত্রী এবং দুই আদরের মেয়ে। খবরটি শোনার পর যেন পাথর হয়ে যান পিন্টু। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। যে বাসে তিনি নিজে প্রতিদিন চালান, সেই বাসই কেড়ে নিল তার সবকিছু।
শোকে স্তব্ধ পিন্টু মিয়ার চোখে অশ্রু নেই—কান্নাও যেন শুকিয়ে গেছে। তার প্রাণ যেন নিথর হয়ে গেছে। পিন্টু মিয়া বলেন, ‘আমি বেঁচে আছি, কিন্তু আমার ভেতরে কিছুই নেই। আমার স্ত্রী-সন্তানই ছিল আমার জীবন। আজ তারা নেই, আমি থাকলেও যেন নেই...।’
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের আহাজারি, কান্না, শোকের মাতম—সবকিছুর মাঝেও পিন্টু মিয়া দাঁড়িয়ে আছেন নিশ্চুপ। তার চারপাশে আত্মীয়স্বজনেরা মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায়।
কিন্তু তিনি যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছেন। এই দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, একাধিক পরিবারের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। কিন্তু পিন্টু মিয়ার গল্পটি যেন সবচেয়ে বেশি হৃদয় ভেঙে দেয়—যে বাসের স্টিয়ারিং ধরে তিনি মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতেন, সেই বাসেই তার আপনজনদের প্রাণ চলে গেল।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন