রবিবার, ২২শে মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘ঈদের নামাজে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর একসঙ্গে উপস্থিতি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়’ *** যুদ্ধ বন্ধে মরিয়া ট্রাম্প, আলোচনার জন্য উপযুক্ত ইরানি নেতা খুঁজে পাচ্ছেন না *** যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া নিয়ে মিথ্যাচার করছে উপসাগরীয় দেশগুলো *** ‘এক যুগে বাংলাদেশকে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে ভারত’ *** হলে হলে ছুটছেন তারকারা *** ‘নির্বাসিত’ জীবনে বিশ্বের প্রথম জেন জি ‘রাষ্ট্রপতি’ *** যে কোম্পানির বাস চালান পিন্টু, সেটির বাসেই প্রাণ গেল স্ত্রী ও দুই মেয়ের *** একাত্তরের হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ স্বীকৃতির দাবিতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব *** ‘খায়রুল হক, সেলিনা আইভীসহ অনেকে বিএনপির আমলেও মনগড়া মামলার শিকার’ *** সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন

একাত্তরের হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ স্বীকৃতির দাবিতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৫:৫১ অপরাহ্ন, ২২শে মার্চ ২০২৬

#

ফাইল ছবি

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।

গত শুক্রবার ওহিও অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই প্রস্তাবটি পেশ করেন। বর্তমানে এটি প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির বিবেচনায় রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রস্তাবটি (রেজোলিউশন) উত্থাপন করা হয়েছে। এই উদ্যোগকে ঐতিহাসিক স্বীকৃতির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হওয়ার পর বাঙালিদের ওপর চালানো ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঐতিহাসিক স্বীকৃতির দাবি

প্রস্তাব উত্থাপনের সময় ল্যান্ডসম্যান বলেন, ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলো ছিল “পরিকল্পিত সন্ত্রাসের অভিযান”, যা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যার মধ্যে পড়ে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের স্বীকৃতি অনেক আগেই দেওয়া উচিত ছিল এবং এটি এখন “দীর্ঘদিনের বকেয়া নৈতিক দায়”।

প্রস্তাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই গণহত্যা স্বীকার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রস্তাবটিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়েছে, সে সময় বাংলাদেশে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, যৌন সহিংসতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সুপরিকল্পিত দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল।

মার্কিন আইনসভা ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘গভট্র্যাক’-এর তথ্য অনুসারে, এই প্রস্তাবে তৎকালীন মার্কিন কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন বিশ্ব সংস্থার নথিভুক্ত বিবরণকে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

গণহত্যার ব্যাপকতা

রেজোলিউশনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের সংঘাতে ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী—দুই লাখের বেশি নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, অসংখ্য গ্রাম, ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ধ্বংস করা হয়।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, সব ধর্মের বাঙালিরাই নির্যাতনের শিকার হলেও বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং তারা মোট ভুক্তভোগীদের বড় অংশ ছিলেন।

ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর অভিযান শুরু করে।

এতে তৎকালীন ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাডের পাঠানো ঐতিহাসিক বার্তার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে তিনি এই রক্তক্ষয়ী সহিংসতাকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

এ ছাড়া প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন ও মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডির নেতৃত্বাধীন উপকমিটির রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই রিপোর্টগুলোতে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো ভয়াবহ ও সুপরিকল্পিত নৃশংসতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এই রেজোলিউশনে ১৯৭১ সালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিলের উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক আর্চার ব্লাডের পাঠানো বিখ্যাত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করা হয়েছিল এবং পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এছাড়া সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন এবং মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির নেতৃত্বে প্রকাশিত রিপোর্টেও ওই সময়ের হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে।

প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু

উত্থাপিত প্রস্তাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে—পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা, বাঙালি হিন্দুদের লক্ষ্য করে নির্যাতনের স্বীকৃতি, কোনো জাতি বা ধর্মকে সামগ্রিকভাবে দায়ী না করার আহ্বান এবং ১৯৭১ সালের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ

পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে এই প্রস্তাব গৃহীত হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন স্বীকৃতি শুধু ইতিহাসের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই নয়, ভবিষ্যতে গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি ভুক্তভোগীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ন্যায়বিচারের দাবিকে আরও জোরালো করবে।

প্রবাসী ও অধিকারকর্মীদের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশি প্রবাসী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলেই এই প্রস্তাব এসেছে এবং এটি পাস হলে ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত এই রেজোলিউশন কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি। প্রস্তাবটি পাস হলে ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হবে এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে।

যদিও এই প্রস্তাবটি পাস হলেও তা সরাসরি আইন হিসেবে কার্যকর হবে না, তবে এটি ১৯৭১-এর নৃশংসতাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। প্রস্তাবটির উদ্যোক্তারা মনে করেন, ঐতিহাসিক সত্য সংরক্ষণ ও ভবিষ্যতে যেকোনো স্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ রোধে এই স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি।

জে.এস/

গণহত্যা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250