ছবি: সংগৃহীত
সংঘাত শুরুর তিন সপ্তাহের যুদ্ধের পর, ট্রাম্প প্রশাসন পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা কেমন ও কীভাবে হতে পারে তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্র অ্যাক্সিওসকে এই তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার বলেছেন, তিনি যুদ্ধ ‘গুটিয়ে আনার’ কথা বিবেচনা করছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ লড়াই চলতে পারে। ইতিমধ্যে, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা কূটনীতির জন্য প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করতে চাইছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের দূত জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ সম্ভাব্য কূটনীতি সংক্রান্ত আলোচনায় জড়িত রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া—যুদ্ধ শেষ করার যেকোনো চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান, এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগাযোগ হয়নি। তবে মিসর, কাতার এবং যুক্তরাজ্য উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করেছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা এবং আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে। মিসর এবং কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে জানিয়েছে, ইরান আলোচনায় আগ্রহী, তবে তাদের শর্তগুলো অত্যন্ত কঠিন।
ইরানি দাবির মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিরতি, ভবিষ্যতে যুদ্ধ আর শুরু হবে না—এমন গ্যারান্টি এবং ক্ষতিপূরণ। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন, ইরানিরা আলোচনার টেবিলে আসবে। কারণ, তাঁর বিশ্বাস, ‘আমরা ইরানের প্রবৃদ্ধি স্তব্ধ করে দিয়েছি।’
ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে ছয়টি প্রতিশ্রুতি চায়:
১. পাঁচ বছরের জন্য কোনো মিসাইল প্রোগ্রাম থাকবে না।
২. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনা।
৩. নাতাঞ্জ, ইস্পাহান এবং ফোরদো পরমাণু কেন্দ্রগুলো অকেজো করা (যেগুলো গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বোমা মেরে ধ্বংস করেছিল)।
৪. সেন্ট্রিফিউজ এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি তৈরির ক্ষেত্রে কঠোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রাখা, যা পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে পারে।
৫. আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি করা, যেখানে মিসাইল সংখ্যা ১,০০০-এর বেশি হবে না।
৬. লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বা গাজার হামাসের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে কোনো অর্থায়ন না করা।
ইরান অতীতে বারবার এই দাবিগুলোর বেশ কয়েকটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের নেতারা এমন একজন প্রেসিডেন্টের (ট্রাম্প) সঙ্গে আলোচনার অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি অতীতে আলোচনায় অংশ নিয়েও হঠাৎ করে হামলা চালিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার তার ভারতীয় কাউন্টারপার্টকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
ট্রাম্পের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি শুক্রবার জানিয়েছেন যে তিনি আলোচনার বিরোধী নন, তবে এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানের দাবিগুলো পূরণ করতে তিনি আগ্রহী নন। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ক্ষতিপূরণের দাবিটিকে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য (non-starter) মনে করেন।
দ্বিতীয় এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনার সুযোগ থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘তারা এটাকে ক্ষতিপূরণ বলছে। আমরা হয়তো একে জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়া বলতে পারি। শব্দচয়নের অনেক উপায় আছে যা তাদের রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে এবং তাদের ব্যবস্থায় ঐকমত্য তৈরিতে সাহায্য করবে।’
ট্রাম্পের দল বর্তমানে দুটি মূল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে: আলোচনার জন্য ইরানে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কে, এবং কোন দেশ সেরা মধ্যস্থতাকারী হতে পারে?
অতীতের পরমাণু আলোচনায় আব্বাস আরাগচি প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন, কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তাকে চুক্তি করার ক্ষমতাসম্পন্ন কারও বদলে কেবল একটি ‘ফ্যাক্স মেশিন’ (বার্তা বাহক) হিসেবে দেখেন। তারা বোঝার চেষ্টা করছেন ইরানে আসলে সিদ্ধান্ত নেয় কে এবং তাদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করা যায়।
যদিও ওমান গত দফার পরমাণু আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছিল, তবে ওমানিদের সঙ্গে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন কোনো মধ্যস্থতাকারী খুঁজছে, আদর্শগতভাবে কাতারকে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাতার গাজায় কার্যকর এবং বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, কাতারিরা পর্দার আড়ালে সাহায্য করতে ইচ্ছুক, তবে তারা মূল আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হতে চায় না। সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিকট ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তার জন্য প্রস্তুত থাকতে চান। উইটকফ এবং কুশনারের শর্তগুলো যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই দিন আগে জেনেভায় তাদের উপস্থাপিত শর্তগুলোর মতোই হবে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন