ফাইল ছবি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। সেদিন থেকেই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা। ধারণা করা হয়েছিল, ভারত হয়তো তার জন্য একটি অস্থায়ী আশ্রয়স্থল। সেখান থেকে তিনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্য কোনো দেশে চলে যেতে পারেন। সেই জল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়নি। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শেখ হাসিনা ভারতের রাজধানী দিল্লিতেই অবস্থান করছেন।
১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। এই ঘোষণার পর তার দুই বছর ভারতেই অবস্থান করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রশ্ন ওঠে—যদি দেশে ফেরার পরিকল্পনাই থেকে থাকে, তাহলে শুরু থেকেই কেন তিনি ভারত ছেড়ে অন্য কোনো দেশে যাননি? তিনি কি ভবিষ্যতে দেশে ফেরার সহজ পথ খোলা রাখতেই ভারতে অবস্থান করেছেন? নাকি ভারতও নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় তাকে সেখানে থাকতে উৎসাহিত করেছে?
দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ, ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতামত এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দেশে ফেরার সম্ভাবনা অক্ষুণ্ন রাখা, ভারতের কৌশলগত হিসাব, অন্য কয়েকটি দেশে অনিশ্চিত অবস্থান এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতেই থেকে যান।
চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান প্রথমে ভারতের উত্তর প্রদেশের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। এরপর তিনি দিল্লিতে যান। সেই সময় থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার সম্ভাব্য গন্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে, যুক্তরাজ্যের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। কারণ, তার পরিবারের কয়েক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছেন।
ওই বছরের ৭ আগস্ট ভারতের দ্য হিন্দু ও টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে জানায়, শেখ হাসিনার চূড়ান্ত গন্তব্য নিয়ে তখনও অনিশ্চয়তা ছিল। হিন্দু লিখেছিল, যুক্তরাজ্যের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সম্ভাবনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব বা ফিনল্যান্ডের মতো বিকল্প নিয়ে ভাবছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, তিনি এমন দেশগুলো বিবেচনা করতে পারেন, যেখানে তার পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছেন—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড বা ভারত।
এর এক দিন আগে, ৬ আগস্ট সিএনএনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিউজ১৮ দেশের আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার ভিসা বাতিল করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কখনো এ দাবি নিশ্চিত করেনি এবং এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্যও করেনি।
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার চেষ্টা করছেন। ওই সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও যুক্তরাজ্যের তখনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়। পরে জয়শঙ্কর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, তারা বাংলাদেশ ও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ওই ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য গন্তব্য নিয়ে দুই মন্ত্রীর মধ্যে আলাদা কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই কিছু জানায়নি।
এই সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য আসে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে। চব্বিশের ৮ আগস্ট ভারতের বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি শেখ হাসিনার যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার খবরকে 'গুজব' বলে উড়িয়ে দেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তার মায়ের ভিসা বাতিল করেছে—এ দাবিও তিনি নাকচ করেন।
জয় সে সময় বলেছিলেন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তার ভাষ্য ছিল, ‘আজ হোক বা কাল হোক, দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। তখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসবেন।’ তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা দেশের মানুষকে ছেড়ে যাবেন না এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও একা ফেলে রাখবেন না।
দুই বছর পর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সেই মন্তব্যের একটি স্পষ্ট মিল খুঁজে পান আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। তাদের মতে, শুরু থেকেই দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসনের বদলে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে দেশে ফেরার পরিকল্পনাই ছিল শেখ হাসিনার। সবশেষ রয়টার্সকে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা সেই ধারণাকেই আরও জোরালো করেছে। যদিও আওয়ামী লীগ বা ভারত সরকার কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেনি।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান অব্যাহত থাকার পেছনে ভৌগোলিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত রয়েছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা আইনি পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তুলনামূলক সহজ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে অবস্থান করলে দেশে ফেরার পুরো প্রক্রিয়া নির্ভর করত আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, ভিসা নীতি এবং তৃতীয় দেশের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ২০০৭ সালের অভিজ্ঞতাও শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় ছিল ভারতে অবস্থান করার বিষয়ে। সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। যদিও ২০০৭ আর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়, তবু নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে, সে অভিজ্ঞতা তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, চব্বিশে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয় গণআন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে। এমন পরিস্থিতির কারণে অন্য দেশ থেকে ভবিষ্যতে দেশে ফেরার চেয়ে ভারত থেকে ফেরা সহজ।
অবশ্য শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এমন কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নেই, যার কারণে কোনো বিমান সংস্থা আইনগতভাবে তাকে বহন করতে পারবে না। তবে তাকে বহন করবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের নির্দেশনা, ভিসা নীতি এবং বিমান সংস্থার নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। সে তুলনায় ভারত থেকে স্থল বা আকাশ—উভয় পথেই বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বেশি।
বিবিসি বাংলার সাবেক সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাবির মুস্তাফা মনে করেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকলে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা ভারতের জন্য প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন নয়। প্রয়োজনে ভারত সরকার চার্টার্ড বিমানের ব্যবস্থাও করতে পারে। তার মতে, বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের পাসপোর্টের মেয়াদ না থাকলেও ভারতের ইমিগ্রেশন তাদের বিমানে চড়তে বাধা দেবে না।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও শেখ হাসিনার দেশটিতে অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষকদের ভাষ্য, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে নিজের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের কাছে শুধু প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়; বরং তা তাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক ভারতীয় বিশ্লেষকের ধারণা, শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া দিল্লির জন্যও একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল। যদি তিনি দেশে ফিরে রাজনৈতিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তাহলে ভারত বলতে পারবে, তারা তাকে স্থায়ী রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়নি; মানবিক বিবেচনায় সাময়িকভাবে থাকার সুযোগ দিয়েছিল। আবার যদি তিনি ফিরতে না পারেন, সেক্ষেত্রেও ভারত বলতে পারবে, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ছিল শেখ হাসিনার নিজস্ব; কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
অর্থাৎ, উভয় ক্ষেত্রেই ভারতের জন্য কূটনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ থেকে যায়। আবার শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে একচেটিয়া সমর্থন দেওয়ার যে অভিযোগ আছে ভারতের বিরুদ্ধে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে দেশটি বলতে পারবে, কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, ভারত সম্পর্ক রাখে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে।
যদিও ভারত সরকার এ বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কখনোই শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেনি। প্রতিবারই বলা হয়েছে, মানবিক বিবেচনায় তাকে সাময়িকভাবে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থান থেকেই দিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করেনি।
গত দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং এর সঙ্গে একাধিক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও বাস্তব কারণ জড়িয়ে আছে। প্রথমত, দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে জীবিত রাখা। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত রাজনৈতিক আশ্রয়ের ইঙ্গিত না পাওয়া। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী দেশ হিসেবে ভারতের ভৌগোলিক সুবিধা। চতুর্থত, ভারতও নিজস্ব কৌশলগত বিবেচনায় তাকে নিজের ভূখণ্ডে রাখাকে সুবিধাজনক মনে করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষক ধারণা দেন, যদিও দিল্লি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এমন অবস্থান স্বীকার করেনি।
এখন শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে পারবেন কি না, সেটি নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আদালতের প্রক্রিয়া, তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর অগ্রগতি, ভ্রমণসংক্রান্ত প্রশাসনিক বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান—সবকিছু মিলিয়েই সেই বাস্তবতা নির্ধারিত হবে।
তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতকে সাময়িক আশ্রয় হিসেবে দেখার যে ধারণা ছিল, গত দুই বছরে তা বদলে গেছে। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, শেখ হাসিনার ভারতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিকল্পনা, ভৌগোলিক সুবিধা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
খবরটি শেয়ার করুন