শরীয়তপুরে গত জানুয়ারিতে বোমা বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ঘর। ফাইল ছবি
মাদারীপুরে মসজিদের ইমামের থাকার ঘরে বিস্ফোরণ, ঢাকার সাভারে একের পর এক বোমা উদ্ধার, রাজধানীর মতিঝিলে ছাতার ভেতর বোমা, কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ—সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক ব্যবহারের প্রবণতা নতুন করে সামনে এসেছে। কোথাও এসব ঘটনায় স্থানীয় বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার বা রাজনৈতিক সংঘাতের কথা বলছে পুলিশ। আবার কয়েকটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে।
গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ১১টি ঘটনা নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে একই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, এসব ঘটনার কিছু ছিল বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া এলাকায় একটি ঘরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘরটি আল-আকসা আকন বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম আকাশ হাওলাদারের থাকার জন্য ব্যবহৃত হতো। চিকিৎসার জন্য তিনি বর্তমানে ঢাকায় আছেন। বিস্ফোরণে ঘরের টিনের বেড়া উড়ে গেলেও কেউ হতাহত হননি। খবর পেয়ে সদর মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক করা হয়েছে।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারিহা রফিক ভাবনা আজ বুধবার দুপুরে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে বোমার আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাদারীপুরে ঘরে ঘরে ককটেল বা বোমাজাতীয় বিস্ফোরক তৈরির একটি প্রবণতা রয়েছে। স্থানীয় বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ ও শক্তি প্রদর্শনে এসব বিস্ফোরক ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে প্রাথমিকভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখছে পুলিশ।
কিন্তু মাদারীপুরের ঘটনাগুলোর পাশাপাশি দেশের অন্য এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দেখলে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে মাদারীপুরে তিনটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ১৫ আগস্ট কালকিনি পৌর এলাকার একটি মহিলা মাদ্রাসায় ককটেল বিস্ফোরণে পাঁচ শিশু শিক্ষার্থী আহত হয়। এর আগে ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের দক্ষিণ ঝিকরহাটি এলাকার একটি পরিত্যক্ত ঘরে হাতবোমা বিস্ফোরিত হয়। এরপর ইমামের ঘরে বিস্ফোরণ।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ঢাকার সাভার। ১১ আগস্ট হেমায়েতপুর থেকে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান নামের এক যুবককে পাঁচটি পাইপ বোমা ও ছুরিসদৃশ তিনটি বোমাসহ গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। সেখান থেকে ছয়টি বোমা এবং বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম ও রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের মামলায় আরিফের সঙ্গে নাজমুল হাসান মামুন, আব্বাস আলী, কামাল হোসেন ওরফে ডাক্তার, বাপ্পী ও রাকিবসহ অজ্ঞাতনামা আরও ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে তাদের নিষিদ্ধ নব্য জেএমবির সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে তারা বিস্ফোরক সংগ্রহ করেছিলেন।
পরদিন ১২ আগস্ট সাভারের সাধাপুরে একটি মসজিদের মাঠে নীল প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর থেকে কালো টেপে মোড়ানো একটি প্রেশার কুকার উদ্ধার করা হয়। পুলিশ পরে সেটিকে শক্তিশালী বোমা হিসেবে শনাক্ত করে। ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করে। বিস্ফোরণের সময় বিকট শব্দে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানিয়েছিল, তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি রাতে ড্রামটি সেখানে রেখে গিয়েছিল।
এর মাত্র দুই দিন আগে, ৩০ জুলাই, সাভারের আশুলিয়ার একটি মুদিদোকানের সামনে ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে প্রেশার কুকারে তৈরি বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে সেটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়। পুলিশের তদন্তে ওই ঘটনার সঙ্গেও সাভারের সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এরও আগে ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। বোমাটি নিষ্ক্রিয়কারী দল নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করে। কারা সেখানে বোমাটি রেখেছিল, তখন তা জানা যায়নি। পরে পুলিশ ওই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করে এবং কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও কুমিল্লার সাম্প্রতিক কয়েকটি বিস্ফোরণের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র যাচাই শুরু করে।
তদন্তে এর আগের ঘটনাগুলোরও একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে। ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় উম্মাল কুরা আন্তর্জাতিক মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে ভবনের দেয়াল উড়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে ককটেলসদৃশ বস্তু, বিপুল রাসায়নিক পদার্থ ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরে ওই ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশের মামলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়।
কেরানীগঞ্জের ওই ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া একটি মুঠোফোনের তথ্যের ভিত্তিতে ১ ফেব্রুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়ায় অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হাফিজ খালিদ ইব্রাহিমের ব্যক্তিগত গাড়িচালকের বাসা থেকে ১০টি শক্তিশালী গ্রেনেড, তিনটি বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরে আরও কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে একই গোষ্ঠীর যোগসূত্র পাওয়ার কথা জানান।
তদন্তে যেসব ঘটনার কথা এসেছে, সেগুলোর মধ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে হামলা, ৭ মার্চ কুমিল্লার একটি মন্দিরে বোমা হামলা, ২৫ মার্চ যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে তল্লাশির সময় পাইপ বোমা বিস্ফোরণ, ২২ জুন উত্তরার দক্ষিণখানে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর বোমা হামলা এবং ২৪ জুলাই মতিঝিলে বোমা উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। এর সঙ্গে ৩০ জুলাই আশুলিয়া ও আগস্টে সাভারের দুই ঘটনাকে মিলিয়ে মোট ১১টি ঘটনার মধ্যে একই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।
এই ধারাবাহিকতায় পুলিশের সন্দেহের কেন্দ্রে এসেছে নব্য জেএমবির কয়েক সদস্য। তাদের মধ্যে নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’-এর নামও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা তাকে সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা-সংক্রান্ত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করছেন। আগস্টে ঢাকার ডেমরায় তার কথিত সহযোগী জুয়েল ভূঁইয়াকে দুটি হাতে তৈরি বোমাসহ আটক করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক শুধু বিস্ফোরণ নয়; বরং কোথাও বোমা বানানোর সরঞ্জাম, কোথাও একসঙ্গে একাধিক পাইপ বোমা, কোথাও প্রেশার কুকারে তৈরি বিস্ফোরক এবং কোথাও জনসমাগম বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে বোমা পাওয়ার ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এখন মূল প্রশ্ন—এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধের অংশ, নাকি স্থানীয় অপরাধী চক্র ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আলাদা আলাদা তৎপরতা একই সময়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সাভার ও কেরানীগঞ্জের তদন্তে যে যোগসূত্রের কথা উঠে এসেছে, তা যদি আরও প্রমাণিত হয়, তাহলে সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন ককটেল বিস্ফোরণ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না।
খবরটি শেয়ার করুন