ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি দেশে ফিরে কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন। তবে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে—এমন পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে তিনি দেশে ফিরছেন বলে দলের ভেতরে আলোচনা আছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তিনি দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন? এই প্রশ্ন থেকেই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করছে, শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হলেও দেশে অবস্থান করা নেতাদের দলীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। বিদেশে অবস্থান করা নেতারাও এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবেন। দলের নেতারা চান, এমন পরিস্থিতিতে দেশে থাকা নেতারা মাঠে সক্রিয় থাকুন।
যদিও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে নিষিদ্ধ। ২০২৫ সালের মে মাসে দলটির সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ওই নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া চলা অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সেই আলোচনারই একটি অংশ হলো, শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে তার অনুপস্থিতিতে কে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ক্ষেত্রে অতীতের নজিরও সামনে আনা হচ্ছে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলে জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুল জলিল। তিনিও কারাগারে ছিলেন। অর্থাৎ জিল্লুর রহমান যখন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন না।
তৎকালীন পরিস্থিতিতে জিল্লুর রহমানই দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নেন। দলীয় কর্মসূচি, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্র বলছে, এবারও ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকা ব্যক্তিকেই দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাছাড়া সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ভারতে পলাতক। তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফিরছেন না। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। তাই সম্ভাব্য ব্যক্তিদের আলোচনায় সাবের হোসেন চৌধুরী, সেলিনা হায়াৎ আইভী ও শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম রয়েছে। তারা কেউ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে নেই।
এক-এগারোর সময়ের নজির দেখিয়ে দলের নেতারা বলছেন, এ ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হতে পারে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দলের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সক্ষমতা।
এর বাইরে আরেকটি ভাবনাও আওয়ামী লীগের ভেতরে আছে। আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে দলে ফিরিয়ে এনে তাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এটি এখনো আলোচনার পর্যায়েই আছে। তাকে দলে ফেরানোর কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি অনুষ্ঠানে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে মন্তব্যের পর তাকে নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদও হারান। এরপর তাকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়।
২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
শেখ হাসিনা কারাবন্দী হলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কে হবেন—এ আলোচনায় আরেকটি নামও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত তিনজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
জয় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের নেতারাই বলছেন, আপাতত তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই। তবু তাকে দলের নেতৃত্বে আনার ভাবনা রয়েছে। এর পেছনে বিএনপির সাম্প্রতিক নজিরকে আওয়ামী লীগের ভেতরে উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তার ছেলে তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। তখন তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন। অর্থাৎ দলের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব দিতে দেশে অবস্থান করাই একমাত্র শর্ত নয়—এমন যুক্তিও আওয়ামী লীগের আলোচনায় রয়েছে।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। সেদিনই রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই দিনে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। ওই মামলায় তারেক রহমানসহ আরও পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতের প্রক্রিয়ায় সেই রায় বাতিল হয়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান খালাস পান।
তবে বিএনপিতে এর আগে এমন নজির ছিল না যে খালেদা জিয়া অনুপস্থিত থাকলেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হবে। ১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন হওয়ার পর দীর্ঘ সময়েও কেউ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হননি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনবার খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাকে তখন ঢাকা সেনানিবাসের বাড়িতেই গৃহবন্দী রাখা হয়। সে সময় দলের চেয়ারম্যান হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে খালেদা জিয়া আত্মগোপনে গেলেও বিএনপিতে কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়নি।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জরুরি অবস্থার সময় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। এক বছরের বেশি সময় তাকে একটি বাড়িতে বন্দী রাখা হয়েছিল। পাশের বাড়িতেই ছিলেন শেখ হাসিনা। ওই সময় শেখ হাসিনাও কারাগারে ছিলেন।
এক-এগারোর সরকার আমলে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি বৈঠকে কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সেটি দলের সব সদস্যের সমর্থনে হয়নি। ফলে সাইফুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। বিএনপির ভেতরের বিরোধের কারণে ওই উদ্যোগ টেকেনি।
এ কারণে আওয়ামী লীগের বর্তমান আলোচনায় বিএনপির সেই অভিজ্ঞতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। দলের নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে নেতৃত্বের প্রশ্নটি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। কারণ নেতৃত্বের বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে দলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এদিকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। রয়টার্সের ১০ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় থেকে ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের কথাও বলেছেন।
এর তিন দিন পর রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে কারাগারে যেতে হতে পারে। তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়াও বহাল থাকবে।
আল জাজিরাও শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মুখেও তিনি দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন।
আগস্টে নয়াদিল্লিতে একটি ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা আবারও দেশে ফেরার কথা বলেন এবং আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকার কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। ভারতও জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি বেসরকারিভাবে আয়োজিত হয়েছিল এবং এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
এদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকলেও দলটির নেতা-কর্মীদের তৎপরতা পুরোপুরি থেমে নেই। চলতি বছরের জুনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। সম্ভাব্য মিছিল ও সংঘাত ঠেকাতে ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়েও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে রাজধানীতে একটি কথিত প্রস্তুতি সভা থেকে আওয়ামী লীগের ৫২ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনেও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার তথ্য এসেছে।
এই বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে নেতৃত্বের বিকল্প নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। দলের একাংশ প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাকে সামনে রাখার কথা ভাবছে। আরেক অংশের আলোচনায় রয়েছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম। একই সঙ্গে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে দলে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাও কেউ কেউ দেখছেন।
তবে এসব নামের কোনোটিই এখনো আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও বর্তমানে নিষিদ্ধ। ফলে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর বাস্তবে দলের সাংগঠনিক কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি অনেকটাই নির্ভর করবে তখনকার রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতির ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন