ফাইল ছবি
ভারত সরকার দেশটির সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। শেখ হাসিনা সম্প্রতি চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা জানানোর পর ভারত সরকারের এই অবস্থান সামনে এসেছে। আজ শুক্রবার প্রকাশিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম, ‘গভর্নমেন্ট টু হাউস প্যানেল: শেখ হাসিনা নট অ্যালাউড টু কন্ডাক্ট পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিটিজ ফ্রম ইন্ডিয়া’। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ-অনুরোধ ভারতের প্রচলিত আইন, বিচারিক কাঠামো এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে দেখছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ভারত থেকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। একই সময়ে ভারতের সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ঘিরে ভারতের নীতিগত অবস্থানও উঠে এসেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিরোধী দল কংগ্রেসের সাংসদ শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি মনে করে, শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি ভারতের ‘সভ্যতাগত সংস্কৃতি’ এবং চরম বিপদ বা অস্তিত্বের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে একই সঙ্গে কমিটি উল্লেখ করেছে, ভারত এমন নীতিও কঠোরভাবে অনুসরণ করে যে, তার ভূখণ্ড কোনো অন্য দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই কমিটিকে ভারত সরকার জানিয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে কমিটি ভারত সরকারকে সুপারিশ করেছে, তারা যেন মানবিক ও নীতিগত অবস্থান বজায় রাখে এবং একই সঙ্গে এ ধরনের সংবেদনশীল পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতের ভিসা কার্যক্রমও গুরুত্ব পেয়েছে। সংসদীয় কমিটি বলেছে, দীর্ঘদিন সীমিত আকারে ভিসা দেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। তাই দ্রুত ভিসা কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ভারত ২০২৬ সালের ২৮ জুন বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করে।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও সংসদীয় কমিটি ভারত সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো নবায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। তাই জলপ্রবাহের হালনাগাদ তথ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারের মতামত বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার সঙ্গে বিলম্ব না করে আলোচনা শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে অব্যাহত রাখে, সেই সুপারিশও করেছে কমিটি। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এর আগেও স্পষ্ট করেছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। ১৭ জুলাই নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণের অনুরোধ ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রত্যর্পণের মতো বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তা প্রচলিত আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতার আলোকে বিবেচনা করা হয়।
সেই ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাইলে রণধীর জয়সওয়াল আগের বক্তব্যের পুনরুল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধটি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া হবে কি না কিংবা এ বিষয়ে কোনো সময়সীমা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো আরেকটি প্রত্যর্পণ-অনুরোধ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে ভারতীয় পুলিশ আটক করেছে বলে বাংলাদেশের দাবি উল্লেখ করে এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, নির্দিষ্ট ওই মামলার বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে তিনি পুনরায় বলেন, যেকোনো প্রত্যর্পণ-অনুরোধই ভারতের আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুসারেই নিষ্পত্তি করা হয়।
তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে কয়েকটি সীমাবদ্ধতাও লক্ষণীয়। প্রতিবেদনে ভারত সরকারের অবস্থান এবং সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলেও বাংলাদেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত কিংবা শেখ হাসিনা বা তার রাজনৈতিক দলের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে বিষয়টির একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে উপস্থাপিত হয়নি। প্রতিবেদনে ভারতীয় কোনো কর্তৃপক্ষেরও বক্তব্য নেই।
এ ছাড়া ‘শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি’—এই বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগ বা এর অর্থ কী, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে রাজনৈতিক বক্তব্য, দলীয় বার্তা, অনলাইন ভাষণ বা দলীয় যোগাযোগের কোন কোন কর্মকাণ্ড এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। আবার ভারত সরকার কীভাবে এই নীতি বাস্তবায়ন করছে, সে সম্পর্কেও প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
প্রতিবেদনটিতে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, এগুলোর বাস্তবায়ন, আইনি বাধ্যবাধকতা কিংবা সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য যোগ করা হয়নি। ফলে পাঠকের সামনে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের কিছু অংশ অনুপস্থিত থেকে গেছে।
সব মিলিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে ভারতের সংসদীয় কমিটি ও সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় এর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য উভয় দেশের সরকারি অবস্থান, আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
খবরটি শেয়ার করুন