ছবি: সংগৃহীত
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, জনবুদ্ধিজীবী এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পেছনে একটি ঐতিহাসিক কারণ আছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যেসব সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা রাষ্ট্রীয় পরিসর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলেছিল। এই ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই শেখ হাসিনার অবস্থান কঠোর হয়ে ওঠে।
দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির দুটি স্তম্ভের একটি আওয়ামী লীগ ৭৭ বছরের ইতিহাস ধারণ করা একটি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে। রাজনীতি থেকে আওয়ামী শক্তি হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টির সুরাহা সরকারকেই করতে হবে। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের ‘সংস্কারকৃত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, চব্বিশের আন্দোলনের মধ্যে এমন কিছু গোষ্ঠী ছিল, যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠেছিল এবং চব্বিশের ৫ই আগস্টের পর তারা তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে নিয়ে এসেছে। আবার একটি অংশের মধ্যে শেখ হাসিনা ও তার দলের প্রতি প্রবল বিরূপ মনোভাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিরূপ মনোভাবে রূপান্তরিত হয়েছিল। এই দুই অবস্থানই ছাত্র আন্দোলনের যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, তার উল্টো ফল বয়ে এনেছে।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যারা আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থিত রয়েছে, তারা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানে সুযোগ নিয়েছে, এর ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং সম্ভবত অভ্যুত্থানের গতিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করেন ড. রেহমান সোবহান।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান প্রাথমিকভাবে শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত থেকে। স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারদের জন্য কোটা চালু রাখাটা ছিল উদ্ভট ধরনের ভুল। শেখ হাসিনা প্রথমে কোটা বাতিল করেছিলেন এবং পরে হাইকোর্ট কোটা পুনঃপ্রবর্তনের রায় দিলে তার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তারা জোরালো নির্বাচনী সম্ভাবনাসহ আরও দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা এই সুযোগকে ব্যবহার করে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের যে ঐতিহাসিক সহযোগিতার ভূমিকা, সেটাকে নতুন ভাষ্য দিতে চাইছে। রাজনৈতিকভাবে কৌশলী নেতাদের নেতৃত্বে তারা এই পর্যায়ে তাদের মুক্তিযুদ্ধ–সম্পর্কিত অবস্থান কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে প্রকাশ করবে। ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা সাফসুতরো করার ক্ষেত্রে এটা তাদের একটা রাজনৈতিক কৌশল।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রেহমান সোবহান এসব কথা বলেন। তার সাক্ষাৎকারটি আজ মঙ্গলবার (১৬ই ডিসেম্বর) 'গণতান্ত্রিক ব্যর্থতার সুযোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি' শিরোনামে পত্রিকাটি প্রকাশ করে। রেহমান সোবহান ১৯৬০-এর দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য। ১৯৯০ সালে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
রেহমান সোবহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণে আমাদের ব্যর্থতা, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট ও রাজনীতিতে গোত্রচর্চা, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ডানপন্থার উত্থান, ছাত্রদের তৃতীয় রাজনৈতিক ধারা হয়ে উঠতে না পারা, মুক্তিযুদ্ধের অবিরাম লড়াই ইত্যাদি বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া ও মনোজ দে।
রেহমান সোবহান বলেন, যে প্রশ্নটি নিয়ে কেউই প্রকাশ্যে আলোচনা করতে চান না, তা হলো, দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির দুটি স্তম্ভের একটি হিসেবে থাকা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে। দলটি ৭৭ বছরের ইতিহাস ধারণ করা একটি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে। তাদের যত ভুল ও অন্যায়ই থাকুক না কেন, আমাদের এই গোত্রভিত্তিক রাজনীতি থেকে আওয়ামী শক্তি হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।
তার মতে, এই বিষয়টির সুরাহা নির্বাচিত সরকারকেই করতে হবে। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের ‘সংস্কারকৃত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশের অর্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। ১৯৭১-পূর্ব সময়ে প্রায় সব সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকেই পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান পিছিয়ে ছিল। বর্তমানে জিডিপি থেকে শুরু করে মানব উন্নয়ন—কার্যত সব উন্নয়ন সূচকেই পাকিস্তানের চেয়ে আমরা এগিয়ে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে শোষণমুক্ত একটি সমাজ গঠনের লক্ষ্য থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। সে কারণে অর্থনৈতিক অসমতা ও সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর, বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর, শেখ হাসিনা তার পিতার ভাবমূর্তিকে মাত্রাতিরিক্তভাবে মহিমান্বিত করে সামনে আনেন এবং মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ও গুরুত্ব অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরেন।
তার মতে, বাস্তব সত্য হলো, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এবং বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে একটি অগ্রণী শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল। তবে এটাও সত্য, এই সংগ্রামে অন্য রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং সাধারণ মানুষও মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালেই যেমন এসব ভূমিকার পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল, তেমনি পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার শাসনামলেও তা আরও স্পষ্টভাবে স্বীকার করা দরকার ছিল। মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগকে একচ্ছত্র ও একমাত্র প্রধান শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক দিক থেকে যেমন ভুল ছিল, তেমনি নৈতিক দিক থেকেও তা ভুল ছিল। এর ফল শুধু আওয়ামী লীগের জন্যই ক্ষতিকর হয়নি; এতে সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ভুল তথ্যের বিস্তার এবং সেই ভুল তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে আমাদের ইতিহাসের (মুক্তিযুদ্ধ) এই গঠনমূলক ও নির্ণায়ক পর্ব সম্পর্কে পুরো একটি প্রজন্মের উপলব্ধি গুরুতরভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন