রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ

সুখবর এক্সপ্লেইনার

মৃত্যুদণ্ডের রায়, নিষিদ্ধ দল, তবু দেশে ফেরার ঘোষণা—শেখ হাসিনার বার্তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কী

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৬:২১ অপরাহ্ন, ২৮শে জুন ২০২৬

#

ফাইল ছবি

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আবারও ঘোষণা দিয়েছেন, সব বাধা অতিক্রম করে তিনি চলতি বছরই বাংলাদেশে ফিরবেন। তার এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলের শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ মামলা, গ্রেপ্তার বা আত্মগোপনের মধ্যে রয়েছেন।

ফলে তার এই বক্তব্য শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা নয়; বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিতে দেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ ইমেল সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, "আমার ফেরা কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত।" তিনি আরও দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় "অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।"

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না... সব বাধা উপেক্ষা করে আমি চলতি বছরই দেশে ফিরব।" তার এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশে তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা জল্পনা চলছিল। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাও গত কয়েক মাসে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে দলীয় সভাপতি দেশে ফিরতে পারেন। তবে এবার প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনা নিজেই সময়সীমা উল্লেখ করে দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা মূলত রাজনৈতিক কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং সমর্থকদের সংগঠিত রাখার একটি কৌশলও হতে পারে। কারণ প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি বলে দলটি দাবি করে আসছে। শেখ হাসিনাও সাক্ষাৎকারে বলেন, "আওয়ামী লীগ শুধু একটি কাগুজে সংগঠন নয়, এটি একটি শক্তি।"

সাক্ষাৎকারের বড় একটি অংশজুড়ে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নিরাপত্তা নেই; অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে এবং উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগকে দমন করার চেষ্টা যত বাড়ছে, দলটি তত শক্তিশালী হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে সামনে এনে বর্তমান সংকটকে অতীতের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের সঙ্গে তুলনা করতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর।"

এনডিটিভির সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে "অবৈধ" ও "দখলদার" হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে আওয়ামী লীগই জনগণের সমর্থন নিয়ে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরবে।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক জটিল। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত এবং শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বহু মামলা চলমান। ফলে দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতি করার সুযোগ আদৌ তৈরি হবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে তার বক্তব্য। তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা বেড়েছে। তার ভাষায়, "সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নন, তারা সমান মর্যাদার নাগরিক।" তিনি আরও বলেন, "যারা ধর্মের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু।"

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার বরাবরই দাবি করে এসেছে, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে এ প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

অর্থনীতি নিয়েও শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিভিন্ন উন্নয়ন সূচক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এবং কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্পের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব অর্জনের পাশাপাশি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানের মতো সূচকগুলোকেও একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক মূল্যায়ন তাই একমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়, বরং পরিসংখ্যান ও স্বাধীন গবেষণার আলোকে হওয়াই অধিক গ্রহণযোগ্য।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুতি হিসেবে তুলে ধরেন। তার মতে, মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং উগ্রবাদের বিস্তার—এসব মিলিয়ে দেশের মৌলিক রাষ্ট্রচরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, "বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব আয়োজন করা হয়েছে।"

ভারতে তার বর্তমান জীবন নিয়েও প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে দেশের মানুষের অধিকার তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও তার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে এবং দূর থেকেই তিনি দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এনডিটিভিকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকার কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান আঞ্চলিক কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করে, দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে গেলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, আইনি ও নিরাপত্তাজনিত বহু জটিলতা মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কাছে এই ঘোষণা দলীয় নেতৃত্বের উপস্থিতির একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবেও কাজ করতে পারে।

সব মিলিয়ে এনডিটিভিকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কৌশল, তার ব্যক্তিগত অবস্থান এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি দেশে ফেরার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও সেটি কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নির্ভর করবে আদালতের প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা বাস্তবতা এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নিষিদ্ধ দল, মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং দীর্ঘ নির্বাসনের মধ্যেও শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক লড়াই শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন না। বরং তার ভাষায়, "আমার লড়াই থামেনি... আমি বিশ্বাস করি, মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে এবং আওয়ামী লীগ জনগণের শক্তিতে আবার জেগে উঠবে।"

শেখ হাসিনা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250