ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না—এমন সরাসরি প্রশ্নের জবাব দেননি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বরং প্রশ্নটি কে তুলেছে, কোন সংবাদপত্র এ নিয়ে খবর করেছে এবং ‘কার এত জ্বালা’—এমন পাল্টা প্রশ্ন করেছেন তিনি। এ সময় ২০০৮ সালের জরুরি অবস্থার সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন প্রতিমন্ত্রী।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার, ২৪ আগস্ট। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র তিনদিন পরই তার এমন মন্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশি জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া (বিজেআইএম) নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটি তার মন্তব্য প্রত্যাহার করে নাগরিকত্বের বিষয়ে স্পষ্ট জবাব দেওয়ার দাবি করেছে।
শুক্রবার, ২১ আগস্ট টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। এর আগে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছিলেন। শপথ নেওয়ার পর হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিষয়টি প্রথম জোরালোভাবে সামনে আসে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্লিৎস পত্রিকার সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর ফেসবুক পোস্টের জের ধরে।
শোয়েব চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমায়ুন কবিরকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন এবং এর পক্ষে প্রমাণপত্রও যুক্ত করেন। এরপর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য, প্রশ্ন ও সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন রোববার, ২৩ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলো ‘পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলেটে জন্ম নেওয়া হুমায়ুন কবির মাত্র আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে বেড়ে ওঠেন এবং উচ্চশিক্ষা নেন। যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। একপর্যায়ে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে সেই নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন কি না, তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। বাংলাদেশ সরকারের সূত্রগুলোর কাছেও তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন—এমন তথ্য নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত নাগরিকত্বের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক যোগ্যতা। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে অনধিক এক-দশমাংশ ব্যক্তিকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
আবার ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না। বিদেশি নাগরিকত্ব পরে ত্যাগ করলে যোগ্যতা ফিরে পাওয়ার বিধানও রয়েছে।
এ কারণে হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। তিনি একজন মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ায় প্রশ্নটির উত্তর আরও গুরুত্বপূর্ণ। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকেরা সেই প্রশ্নই করেন। এক সাংবাদিক বলেন, ‘একটা বিষয় উঠেছে, আপনার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব—ওটা ত্যাগ করেছেন কি না, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য দরকার।’
জবাবে হুমায়ুন কবির সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলেননি। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশি। এখানে তো বাংলাদেশের... বাংলাদেশি। আমি মনে করি না, এমন কেউ আছে যে আমার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বা আমার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করবে।’
এরপর সাংবাদিকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং খবর প্রকাশের কথা জানান। তখন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কে নিউজ করছে এটা?’ এক সাংবাদিক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আগের দিন ভাইরাল হয়েছে। তখন হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, আপনি বলেন নেটিজেন! মানে কোন নেটিজেন? আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, কাজ করি।’
পরে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বলেন, ‘কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা যে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তো তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠছে নাকি আবার? মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের জ্বালা উঠছে তার আবার? নাকি?’
এই বক্তব্যের পর বিতর্ক আরও ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, নাগরিকত্বের মতো একটি সাংবিধানিক প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী কেন সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের দিকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লেন। বিজেআইএমও একই প্রশ্ন তুলেছে। গতকাল সোমবার দেওয়া বিবৃতিতে সংগঠনটি হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যকে ‘অপেশাদার’ ও ‘আক্রমণাত্মক’ বলে অভিহিত করে।
সংগঠনটির ভাষ্য, সরকারি দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে করা সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমকে উপহাস করেছেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এতে সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত পেশাদারত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাংবাদিকেরা সরকারের প্রতিপক্ষ নন। তারা জনস্বার্থে প্রশ্ন করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মধ্যে রাখাও তাদের দায়িত্ব।
হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আরেকটি কারণ তার দীর্ঘদিনের যুক্তরাজ্য-সম্পৃক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড। বিজেআইএমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বেনশাম ম্যানরের কাউন্সিলর ছিলেন। ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্রয়ডনের মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে তার সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি সাধারণ পাসপোর্ট জমা দেন। পরে সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেন। গত ছয় মাসে একাধিক দেশ সফর করেছেন সেই সরকারি পাসপোর্টে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের কোম্পানি নিবন্ধকের কার্যালয় ‘কোম্পানিজ হাউজ রেজিস্ট্রার’-এর তথ্য নিয়েও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, ওই তথ্য অনুযায়ী হুমায়ুন কবিরকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং তার আবাসস্থল যুক্তরাজ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে কোনো নথিতে নাম থাকা এবং নির্দিষ্ট তারিখে নাগরিকত্ব ত্যাগ না করার বিষয়টি এক নয়। নাগরিকত্ব ত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনো হুমায়ুন কবির প্রকাশ্যে দেননি।
এ কারণেই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবেও সামনে এসেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেছেন, হুমায়ুন কবির বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না কিংবা ত্যাগ করার জন্য আবেদন করেছেন কি না, তা জনগণ জানে না। তার মতে, সাংবিধানিকভাবে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে দেশে কারও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই।
সোমবারের ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, হুমায়ুন কবির কি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ প্রকাশ করবেন? তিনি যদি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে সেই তথ্য প্রকাশ করাই কি বিতর্কের অবসানের সবচেয়ে সহজ পথ নয়?
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি অংশকে অনেকে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে বলে ধারণা করছেন। বিশেষ করে ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করায় এ ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে হুমায়ুন কবির নিজে কারও নাম উল্লেখ করে বলেননি যে তিনি মতিউর রহমানকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেছেন।
প্রথম আলোর ‘আলপিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি কৌতুককে কেন্দ্র করে ২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময় পত্রিকাটি বিতর্কে জড়িয়েছিল—যা দেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে আলোচিত ঘটনা। ঘটনার একপর্যায়ে প্রথম আলোর সম্পাদক বায়তুল মোকাররম মসজিদের তৎকালীন খতিবের কাছে তওবা করেন। এক এগারোর সরকারকে বিতর্কিতভাবে সমর্থন জানায় প্রথম আলো। এ নিয়ে নানা সমালোচনা আছে পত্রিকাটির। কিন্তু সেই পুরোনো রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম-সম্পর্কিত প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান নাগরিকত্বের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়া কতটা যৌক্তিক, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
এরই মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহও সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্ব নিয়ে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ উত্তর দাবি করেছেন। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকলে তার প্রমাণ দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন আর শুধু কয়েক সাংবাদিকের নয়। প্রশ্নটি এসেছে সংবাদমাধ্যমে। এসেছে সাংবাদিকদের সংগঠন থেকে। এসেছে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সহজ সমাধানও খুব কঠিন কিছু নয়। হুমায়ুন কবির যদি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে তা স্পষ্টভাবে জানানো এবং প্রয়োজনীয় নথি প্রকাশ করা। আর যদি না করে থাকেন, তাহলে সেটিও স্পষ্ট করা। কারণ একজন প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্বের প্রশ্নে ‘আমি বাংলাদেশি’ বলা যথেষ্ট উত্তর নয়। প্রশ্নটি তার দেশপ্রেম নিয়ে নয়। প্রশ্নটি তাঁ সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে।
সোমবারের ঘটনায় তাই মূল প্রশ্নটি এখনো একই জায়গায় আছে। হুমায়ুন কবির কি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে ‘কার এত জ্বালা’ বলা হয়তো রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে জোরালো শোনাতে পারে। কিন্তু এতে মূল প্রশ্নটির উত্তর মেলে না। বরং প্রশ্নটি আরও বড় হয়। আর সেই কারণেই প্রতিমন্ত্রী হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে উদ্বেগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন