শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন কেন, আজ দেখানো হবে টেলিছবিতে *** শেখ হাসিনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ-ভারত মিলে নেবে—আশা যুক্তরাষ্ট্রের *** সন্ত্রাসী দেশ আমাকে এই প্রশ্ন করছে—পাকিস্তানি সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন জয়শঙ্করের *** জাতিসংঘেও কালো সানগ্লাস পরে ভাষণ দিলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু কেন *** যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ দিনের পরিকল্পনায় যা আছে *** বন্দুকের ভঙ্গিতে উদযাপন করে লালকার্ড দেখলেন ইসরায়েলি ফুটবলার *** ‘আমলাদের লেখা আইনের খসড়া অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে’ *** জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভ, অস্কারজয়ী অভিনেত্রীসহ অনেকে গ্রেপ্তার *** জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এবার কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেই *** পাকিস্তান সফরে কবে যাবেন—জবাবে সাংবাদিকদের যা বললেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সুখবর এক্সপ্লেইনার

আমের ঝুড়িতে তারেক রহমান সরকারের বন্ধুত্বের বার্তা

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৯:০৫ অপরাহ্ন, ১৩ই জুন ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

কূটনীতির ভাষা সব সময় চুক্তি, বৈঠক, বা যৌথ ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় একটি ফুল, একটি বই, একটি ফলও হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বের সবচেয়ে আন্তরিক বার্তা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে আঞ্চলিক সম্পর্ক নানা সময় প্রতিযোগিতা, স্বার্থের হিসাব ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগোয়, সেখানে তারেক রহমানের সরকারের পক্ষ থেকে নেপালে ১ হাজার ৭৫০ কেজির বেশি উৎকৃষ্ট মানের আম উপহার পাঠানো নিছক সৌজন্য বিনিময়ের ঘটনা নয়; বরং এটি ‘সফট ডিপ্লোমেসি’ বা নরম কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে নেপালের রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশের বন্ধুদের কাছে আম পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দক্ষিণ এশিয়ায় জনকূটনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকেরা মনে করেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও ইতিবাচক ধারণা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘ফ্রেন্ডশিপ টু অল, ম্যালিস টু নান’ নীতির প্রতিফলন বহুবার দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে মৌসুমি ফল উপহার পাঠানোর মাধ্যমে এক ধরনের ইতিবাচক ঐতিহ্য তৈরি করেছে। এর মধ্যে আম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, আম শুধু একটি ফল নয়; এটি দেশের কৃষি ঐতিহ্য, গ্রামীণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তার প্রতীক।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, নেপালে পাঠানো আমের মধ্যে ছিল জিআই স্বীকৃত ক্ষীরশাপাতি জাতের আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগান থেকে সংগ্রহ করা এ আম দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম সেরা রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচিত। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি আমের বাজার ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে আমকে ঘিরে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুধু সৌজন্যের বার্তা নয়, বরং দেশের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়েরও একটি কার্যকর মাধ্যম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে সফট পাওয়ার বা নরম শক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। কোনো দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্য এবং জনগণের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও সহজ হয়। তার মতে, দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলে জনগণের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধির জন্য সাংস্কৃতিক ও মানবিক কূটনীতি অত্যন্ত কার্যকর।

নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাসও বেশ উষ্ণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নেপাল দ্রুত নতুন রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, পর্যটন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্ককে আরও কৌশলগত মাত্রা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ও নেপাল উভয়ই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের সদস্য। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, তবুও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। অন্যদিকে নেপাল বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ এবং বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগ্রহী। এই বাস্তবতায় জনকূটনীতির ছোট ছোট উদ্যোগগুলোও দীর্ঘমেয়াদে আস্থার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে মানুষের আবেগ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে ভারত বহু বছর ধরে ‘ম্যাঙ্গো ডিপ্লোমেসি’, ‘চা কূটনীতি’ বা সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি ব্যবহার করে আসছে। জাপান তাদের জনপ্রিয় সংস্কৃতি, দক্ষিণ কোরিয়া কে-পপ ও বিনোদন শিল্প, আর তুরস্ক তাদের টেলিভিশন সিরিজ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সফট পাওয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। দেশের ক্ষেত্রেও ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য এবং কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে এমন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক পরিচিতি গঠনে সহায়ক হতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশ কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ধান, মাছ, সবজি ও ফল উৎপাদনে দেশটি বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আম উৎপাদনেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। ফলে কৃষিপণ্যকে কূটনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ একাধিক আলোচনায় বলেছেন, আধুনিক কূটনীতিতে শুধু রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক যথেষ্ট নয়; জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিক্ষা, পর্যটন এবং সৌজন্যভিত্তিক উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করে।

নেপালে পাঠানো আমের এ চালান তাই শুধু উপহার নয়, বরং দেশের পরিচয় বহনকারী এক ধরনের ‘রাষ্ট্রদূত’। একটি আমের প্যাকেট যখন কাঠমান্ডুর কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কূটনীতিকের হাতে পৌঁছায়, তখন তার সঙ্গে পৌঁছে যায় বাংলাদেশের মাটি, কৃষকের পরিশ্রম, গ্রামীণ অর্থনীতির গল্প এবং আতিথেয়তার সংস্কৃতি। কূটনীতির ভাষায় এটি এমন একটি বার্তা, যা আনুষ্ঠানিক নোট বা বিবৃতির চেয়ে অনেক বেশি মানবিক।

এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের ব্র্যান্ডিং। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে এখনও অনেক সময় জনসংখ্যা, জলবায়ু ঝুঁকি বা শ্রমঘন অর্থনীতির পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। অথচ দেশের কৃষি, সংস্কৃতি, উদ্যোক্তা শক্তি এবং খাদ্য ঐতিহ্যও বিশ্বে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। ‘আম কূটনীতি’ সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দেশের ‘আমের রাজধানী’ বলা হয়। সেখানকার ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি বা আম্রপালির মতো জাতগুলো দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পাচ্ছে। ফলে তারেক রহমান সরকারের এমন কূটনৈতিক উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে কৃষিপণ্য শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, জাতীয় ভাবমূর্তিরও অংশ হতে পারে।

বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ধারণা বদলে গেছে। সামরিক শক্তি কিংবা অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষমতাও এখন গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় নেপালে বাংলাদেশের আম উপহার পাঠানোর উদ্যোগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটি দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও দৃশ্যমান করেছে, দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে এবং সফট ডিপ্লোমেসির কার্যকর ব্যবহারের একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

কাঠমান্ডুতে পৌঁছে দেওয়া সেই আমের ঝুড়িগুলো হয়তো কোনো রাজনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করবে না, কিন্তু নেপালের মানুষের মনে বাংলাদেশের জন্য এক টুকরো উষ্ণতা তৈরি করবে। আর কূটনীতির জগতে অনেক সময় সেই উষ্ণতাই হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

বাংলাদেশ-নেপাল

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন কেন, আজ দেখানো হবে টেলিছবিতে

🕒 প্রকাশ: ০২:২৭ পূর্বাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেখ হাসিনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ-ভারত মিলে নেবে—আশা যুক্তরাষ্ট্রের

🕒 প্রকাশ: ০১:৩০ পূর্বাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

সন্ত্রাসী দেশ আমাকে এই প্রশ্ন করছে—পাকিস্তানি সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন জয়শঙ্করের

🕒 প্রকাশ: ১১:৪৯ অপরাহ্ন, ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘেও কালো সানগ্লাস পরে ভাষণ দিলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু কেন

🕒 প্রকাশ: ১১:২১ অপরাহ্ন, ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ দিনের পরিকল্পনায় যা আছে

🕒 প্রকাশ: ১০:৫৩ অপরাহ্ন, ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250