ফাইল ছবি
প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর এবার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে টেলিফোনে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাক্ষাৎকারটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং সময়, ভাষা ও বার্তার দিক থেকে তা নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ইঙ্গিত বহন করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। বলেছেন, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ তিনি এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার যেসব বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল লিখিত বা ই-মেইলের মাধ্যমে। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি প্রথমবারের মতো জানান, চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফিরতে চান। কিন্তু রয়টার্সকে দেওয়া সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে নির্দিষ্ট মাসের কথা বলেছেন। ফলে এটি নিছক একটি সাক্ষাৎকার নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিত একটি বার্তা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের শিরোনাম—বাংলাদেশস হাসিনা প্ল্যানস ডিসেম্বার রিটার্ন উইথ পার্টি কলিগস টু সারেন্ডার। অর্থাৎ, ডিসেম্বরে দলের নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন শেখ হাসিনা। এই শিরোনামই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হতে পারে। তবু তিনি ফিরবেন। তার ভাষায়, যদি মৃত্যুই আসে, তবে সেটি তিনি নিজের দেশেই চান। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ দমন-পীড়নের মুখে রয়েছেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি একদিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে একটি মানসিক বার্তাও দিয়েছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার শুরু হয়। অনুপস্থিত অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের রায় হয়েছে আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধেও। এই পরিস্থিতিতে তার দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা যদি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে চাইতেন, তাহলে তিনি বলতে পারতেন—‘সুযোগ হলে ফিরব’ অথবা ‘পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ফিরব’। কিন্তু তিনি একটি নির্দিষ্ট মাস উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হতে পারে, তিনি অন্তত এমন কিছু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে কথা বলছেন, যা তাকে এই ঘোষণা দেওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
ঢাকার কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আন্তর্জাতিক সমর্থন বা অন্তত কূটনৈতিক পর্যায়ের নীরব বোঝাপড়া ছাড়া এমন ঘোষণা দেওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দেশে ফিরেই যদি তাকে গ্রেপ্তার হতে হয় কিংবা বাস্তবে ফেরাই সম্ভব না হয়, তাহলে সেই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। তাই ডিসেম্বরের কথা প্রকাশ্যে বলার অর্থ হলো, তিনি হয়তো ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা আশাবাদী।
ভারতের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।তবে শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তবে তিনি এটিও বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফিরিয়ে নিতে বারবার ভারতের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে, কিন্তু তিনি প্রত্যর্পণের মাধ্যমে নয়, স্বেচ্ছায় ফিরতে চান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই বক্তব্যের মধ্যেও একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। কারণ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তার দেশে ফেরা কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার ফল নয়; বরং এটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
তবে বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের আওতায় অবস্থান করছেন। ফলে তার যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভারতের অবস্থান পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক—এমনটি বলার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন গবেষক অতীতেও বলেছেন, বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটে ভারতের ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং এনডিটিভি গত কয়েক মাসে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে দিল্লি সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে রয়টার্সও তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা তার নির্বাসন-পরবর্তী অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
শেখ হাসিনা রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে বিচারব্যবস্থার প্রতিও আস্থা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। তার বিশ্বাস, বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষ বুঝতে পারবে আদালত কতটা নিরপেক্ষ বা কতটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিজের বিরুদ্ধে চলমান বিচারকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে, আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা নিজেকে ‘পলাতক’ নন, বরং ‘আইনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত’ একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, যদি তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না-ও পারেন, তবুও কেন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে? জনগণই সিদ্ধান্ত নিক দলটি ভালো না খারাপ। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি দলের রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নকে সামনে এনেছেন।
একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, অনলাইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। ইতিমধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টির নেতাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। অর্থাৎ নির্বাসনে থাকলেও তিনি দলীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এখানেও একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো এখনও সক্রিয় এবং নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়নি—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন শেখ হাসিনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, ডিসেম্বর মাস উল্লেখ করার পেছনে দেশের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চলতি বছরের শেষভাগে দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিচার, নির্বাচন, দলীয় পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে ডিসেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে পারে। শেখ হাসিনার ঘোষণাও সেই সম্ভাব্য সময়ের সঙ্গে মিল রেখেই দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অবশ্য এর বিপরীত মতও রয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়া আর বাস্তবে ফেরা এক বিষয় নয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কার্যকর আদালতের রায় রয়েছে। দেশে ফিরলে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতেই হবে। ফলে ডিসেম্বরে দেশে ফেরা কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নির্ভর করবে সে সময়কার রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতির ওপর।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। প্রায় দুই বছরের মধ্যে এই প্রথম শেখ হাসিনা সরাসরি টেলিফোনে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন। এটি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এত দিন তিনি লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরছিলেন। এখন তিনি সরাসরি কথা বলছেন, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ করছেন। যোগাযোগ কৌশলের এই পরিবর্তনও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রাজনৈতিক নেতা যখন দীর্ঘ নীরবতার পর সরাসরি সাক্ষাৎকার দেন, তখন সেটি সাধারণত নতুন রাজনৈতিক পর্যায়ের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তাৎক্ষণিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। সেখানে লিখিত বিবৃতির মতো ভাষা বেছে নেওয়ার সুযোগ কম থাকে। ফলে এর গ্রহণযোগ্যতাও তুলনামূলক বেশি হয়।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকারে তিনটি বড় বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, তিনি নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে সরিয়ে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। তৃতীয়ত, তিনি দেশে ফেরাকে এখন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিষয় হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরছেন।
ডিসেম্বরে তিনি সত্যিই দেশে ফিরতে পারবেন কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘোষণা ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশের রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এটি নতুন করে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিচারপ্রক্রিয়া, গণতন্ত্র এবং আঞ্চলিক কূটনীতির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। আগামী কয়েক মাসে এই ঘোষণার বাস্তব অগ্রগতি দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
খবরটি শেয়ার করুন