ফাইল ছবি
দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের খবর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বিষয়টি সামনে আসার পর শুধু একটি বহুল আলোচিত দুর্নীতি মামলার ভবিষ্যৎ নিয়েই নয়, বরং বিদেশে অবস্থানরত পলাতক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলীয় নেতা এবং প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশ ছেড়ে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে সরকারি সূত্রের দাবি। ফলে বেনজীর আহমেদের সম্ভাব্য প্রত্যর্পণকে বর্তমান সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখছে।
সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কার্যকর হওয়া এবং এর ভিত্তিতে বিদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দেশ ছাড়ার পর বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের পরোয়ানা জারি হলেও বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেনজীর আহমেদের ঘটনা যদি শেষ পর্যন্ত সফল প্রত্যর্পণের মাধ্যমে আদালতে বিচার পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে এটি বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এটি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
বেনজীর আহমেদ দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং পরে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামোর নেতৃত্বে থাকা একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠা নিজেই একটি বড় ঘটনা। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো শুধু দেশীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় তার নাম আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি আলোচনায় চলে আসেন।
দুদকের তদন্তে তার ও তার পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ব্যাংক হিসাব এবং বিদেশে সম্পদের সম্ভাব্য তথ্য নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান হয়। এই তদন্তের ধারাবাহিকতায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং পরে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক জালিয়াতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত অনেক ব্যক্তি বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক, আইনি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নানা সীমাবদ্ধতা ছিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও সব ক্ষেত্রে পথ বন্ধ হয়ে যায় না। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ আইনি সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়, তাহলে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তাকে ফেরত আনা সম্ভব। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে এবং অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বেনজীর আহমেদের সম্ভাব্য প্রত্যর্পণকে কেন্দ্র করে সরকারের ভেতরে নতুন ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি বিদেশে চলে গেছেন বলে ধারণা করা হয়, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই বর্তমানে তদন্ত চলছে। কেউ কেউ ইতিমধ্যে মামলার আসামি হয়েছেন, আবার কারও বিরুদ্ধে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজনের মতে, যদি একটি বহুল আলোচিত মামলার প্রধান আসামিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তাহলে অন্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ জোরদার করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের ওপরও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, একটি গ্রেপ্তার কিংবা প্রত্যর্পণকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আসল পরীক্ষা হবে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে। কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বহু দেশে দেখা গেছে, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ঘোষণার চেয়ে আদালতে দণ্ড নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন কাজ।
কয়েক আইনবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অতীতে বিভিন্ন আলোচনায় বলেছেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে এর নিরপেক্ষতার ওপর। যদি তদন্ত শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা গেলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, দেশের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের সন্ধান ও পুনরুদ্ধার। দ্বিতীয়ত, বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনা। বেনজীর আহমেদের মামলাটি এই দুই ক্ষেত্রেই একটি পরীক্ষামূলক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ অভিযোগ অনুযায়ী, তার সম্পদের একটি অংশ দেশীয় সীমার বাইরে স্থানান্তরিত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অর্থ পাচারবিরোধী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের মামলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশ অর্থ পাচার রোধে তথ্য বিনিময় ও পারস্পরিক আইনি সহায়তা বৃদ্ধির দিকে এগিয়েছে। ফলে আগে যেসব তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল, এখন সেগুলো তুলনামূলক সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা দুর্নীতি দমন, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং অতীতের অভিযোগগুলোর বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। বেনজীর আহমেদের সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব অগ্রগতির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আওয়ামী লীগের জন্যও একটি নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, কারণ বিদেশে অবস্থানরত দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও মামলাগুলো নতুন গতি পেতে পারে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের সামনে ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের খবর শুধু একজন সাবেক পুলিশ প্রধানের আইনি সংকটের গল্প নয়। এটি দেশের বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সূচনা। শেষ পর্যন্ত তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হলে তা শুধু একটি মামলার অগ্রগতি হবে না; বরং বিদেশে অবস্থানরত অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রের পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।
খবরটি শেয়ার করুন