ফাইল ছবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের কংগ্রেস নেতা র নামে শেখ হাসিনাকে নিয়ে একটি বক্তব্যের ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘শেখ হাসিনা আমার মাতৃতুল্যা। ভারতে থাকতে তার কোনো স্ট্যাটাস প্রয়োজন নেই।’ ফটোকার্ডটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে এটিকে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য হিসেবে ধরে নিয়ে প্রশংসা ও সমর্থন জানাচ্ছেন। তবে অনুসন্ধানে এই বক্তব্যের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফটোকার্ডটিতে রাহুল গান্ধী কবে, কোথায় বা কোন অনুষ্ঠানে এমন কথা বলেছেন—তার কোনো তথ্য নেই। নিচে সূত্র হিসেবে ‘প্রতিদিনের সংবাদ’-এর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। একই ফটোকার্ড ‘দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ’ নামের একটি ফেসবুক পেজেও পাওয়া গেছে। কিন্তু সেখানেও বক্তব্যটির কোনো মূল সূত্র, সংবাদ প্রতিবেদন, ভিডিও বা রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের রেকর্ড দেওয়া হয়নি। ভারতের ‘হেডলাইনস ত্রিপুরা ন্যাশনাল’ নামের একটি ফেসবুক পেজেও একই ধরনের দাবি পাওয়া গেছে; সেখানেও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে বক্তব্যটি সত্য কি না যাচাই করতে রাহুল গান্ধীর শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য এবং এ বিষয়ে ভারতীয় ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের নেতৃত্বে দেশটির সংসদে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে একটি সর্বদলীয় বৈঠক হয়। এতে রাহুল গান্ধীও অংশ নেন। বৈঠকটি নিয়ে ভারতের ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর প্রতিবেদনে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সেখানে তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতির পর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, ঘটনাপ্রবাহে কোনো বিদেশি শক্তির ভূমিকা আছে কি না এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ‘মাতৃতুল্য’ বলা বা ভারতে তার কোনো ‘স্ট্যাটাস’ প্রয়োজন নেই—এমন কোনো বক্তব্যের উল্লেখ নেই।
‘হিন্দুস্তান টাইমস’ আরও জানিয়েছিল, ওই বৈঠকে রাহুল গান্ধী শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ভারত সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। জয়শঙ্কর জানান, ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তবে সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। বৈঠকটির আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা তাকে ভারতে থাকার জন্য বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার মতো কোনো বক্তব্যের তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাহুল গান্ধী পরে বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্যও দিয়েছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে তিনি আশাবাদী এবং বর্তমান সরকার কিংবা ভবিষ্যৎ যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দৃঢ় সম্পর্ক বজায় থাকবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সহিংসতা বন্ধ করা এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথাও জানান তিনি। ডেইলি স্টার পত্রিকা পিটিআইয়ের বরাত দিয়ে রাহুলের ওই বক্তব্য প্রকাশ করেছিল।
ওয়াশিংটনের সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথাও বলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে তার পরিবারের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তার দাদি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন—এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে সেখানেও শেখ হাসিনাকে ‘মাতৃতুল্য’ বলা বা ভারতে তার কোনো মর্যাদা বা অবস্থানের প্রয়োজন নেই—এমন বক্তব্যের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের ‘ঢাকা ডিপ্লোম্যাট’-এর প্রতিবেদনেও রাহুলের ওই বক্তব্যের একই ধরনের বিবরণ রয়েছে।
অর্থাৎ, রাহুল গান্ধীর বাংলাদেশবিষয়ক প্রকাশ্য বক্তব্যে শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ এসেছে মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তার ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং ভারতের স্বার্থ ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। এসব বক্তব্যের কোথাও ভাইরাল ফটোকার্ডে প্রচারিত ব্যক্তিগত মন্তব্যটির সন্ধান মেলে না।
ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ভাষাটিও সন্দেহের কারণ তৈরি করে। সেখানে রাহুল গান্ধীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘ভারতে থাকতে তার কোনো স্ট্যাটাস প্রয়োজন নেই।’ কিন্তু এই বক্তব্যের সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলন, সংসদীয় বৈঠক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাহুল গান্ধীর প্রকাশিত বক্তব্যের সূত্র দেওয়া হয়নি। এমনকি যে গণমাধ্যমের নাম সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনেরও কোনো উল্লেখ নেই।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে কী মর্যাদায় অবস্থান করছেন, তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও তার ভারতে অবস্থানের সুনির্দিষ্ট আইনি বা প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। ফলে ‘ভারতে থাকতে তার কোনো স্ট্যাটাস প্রয়োজন নেই’—এমন একটি নির্দিষ্ট বক্তব্য রাহুল গান্ধীর নামে প্রচার করা হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য সূত্র থাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের গণমাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, শেখ হাসিনা দিল্লির কাছে একটি নিরাপদ স্থানে ছিলেন এবং ভারত সরকার তার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করছিল। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ জানিয়েছিল, শেখ হাসিনা তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন এবং ভারতীয় সরকার তাকে কিছুটা সময় দিচ্ছিল। একই প্রতিবেদনে রাহুল গান্ধীর সর্বদলীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তার নামে ভাইরাল বক্তব্যটির কোনো উল্লেখ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডের কমেন্টগুলোও দেখাচ্ছে, অনেক ব্যবহারকারী এটিকে সত্য বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ রাহুল গান্ধীকে ধন্যবাদ জানিয়ে মন্তব্য করেছেন, আবার কেউ শেখ হাসিনা ও গান্ধী পরিবারের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে প্রশংসা করেছেন। কিন্তু কোনো বক্তব্যকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়ার কারণে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামে প্রচারিত উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে মূল ভিডিও, লিখিত বিবৃতি, সাক্ষাৎকার বা বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থাকা জরুরি। এখানে এমন কোনো প্রাথমিক বা নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি।
তাই ‘শেখ হাসিনা আমার মাতৃতুল্য। ভারতে থাকতে তার কোনো স্ট্যাটাস প্রয়োজন নেই’—এই বক্তব্যটি রাহুল গান্ধী বলেছেন বলে যে দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে, তা সত্য প্রমাণ করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
বরং রাহুল গান্ধীর বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য ও ভারতীয়-বাংলাদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, তার নথিভুক্ত বক্তব্যগুলোর সঙ্গে ভাইরাল ফটোকার্ডের দাবিটির মিল নেই। সুতরাং, আপাতত এটিকে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা একটি অপ্রমাণিত ও সূত্রহীন দাবি বলেই বিবেচনা করা যায়।
খবরটি শেয়ার করুন