ছবি: সংগৃহীত
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট। সংগঠনটি বলেছে, আসামিদের অনুপস্থিতিতে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দ্রুততার সঙ্গে বিচার শেষ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে রায় বাতিল করে সব বিচারিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পুনরায় পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটির আহ্বায়ক আকতার হোসেন ও সদস্য সচিব শেখ জামাল এ উদ্বেগ জানান। বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন সংগঠনের সদস্য আসাদুর রহমান।
বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্য ব্যক্তিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের নেতারা বলেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের বিচার করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এই বিচারপ্রক্রিয়ায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না এবং আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই রায় নিয়েও দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
শেখ হাসিনার ওই রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বলেছিল, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের জন্য দায়ীদের অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। তবে শেখ হাসিনার বিচার ও মৃত্যুদণ্ডকে তারা ন্যায়সংগত ও সুষ্ঠু বিচার হিসেবে বিবেচনা করেনি। সংস্থাটি বিশেষভাবে বিচারপ্রক্রিয়ার দ্রুততা, অনুপস্থিতিতে বিচার, প্রতিরক্ষার প্রস্তুতির জন্য অপর্যাপ্ত সময় এবং মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, এত বড় ও জটিল একটি মামলায় অনুপস্থিতিতে দ্রুত বিচার শেষ করা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। সংস্থাটি আরও বলেছিল, জুলাই ২০২৪-এর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিচার ও জবাবদিহি প্রয়োজন, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড সেই ন্যায়বিচারকে নিশ্চিত করে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচও শেখ হাসিনার রায়ের পর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বরের বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে তাদের পছন্দের আইনজীবী দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ না দিয়ে অনুপস্থিতিতে বিচার করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বক্তব্য অনুযায়ী, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি হলেও সেই বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সংস্থাটি আরও বলেছে, অনুপস্থিতিতে বিচার আসামির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে মৌলিকভাবে দুর্বল করে এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে এ উদ্বেগ আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাও শেখ হাসিনার রায় নিয়ে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্নের বিষয়টি তুলে ধরে। ১৭ নভেম্বরের প্রতিবেদনে এবং পরবর্তী বিশ্লেষণে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও অন্য একজন আসামিকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন তৈরি করেছে। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর আগেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের মানদণ্ড, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিপক্ষের অধিকার ও বিচারকদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল।
রয়টার্স শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া সবচেয়ে কঠোর শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করে। সংস্থাটি জানায়, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় তার অনুপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে রায়ের পর শেখ হাসিনা ট্রাইব্যুনালকে পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেন।
বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, সিএনএন, এএফপি ও গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। ডেইলি স্টারের পর্যালোচনা অনুযায়ী, বিবিসি, আল জাজিরা ও রয়টার্স রায়ের ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করেছিল; সিএনএন, এএফপি ও গার্ডিয়ানও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। এসব প্রতিবেদনে রায়ের পাশাপাশি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার, ভারতের কাছে তাকে প্রত্যর্পণের দাবি এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়গুলোও উঠে আসে।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের মঙ্গলবারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি কিংবা সাধারণ নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়া সাংবিধানিক অধিকার। তাই বিচারপ্রক্রিয়ায় অবশ্যই স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আসামিদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, এসব সুযোগ নিশ্চিত না করে তড়িগড়ি করে একতরফাভাবে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাদের মতে, বিচার শুধু সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়; বিচারপ্রক্রিয়াটিও এমন হতে হবে, যাতে দেশে ও বিদেশে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন না থাকে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘ ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি বলেছে, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় যারা নিহত হয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সেই বিচার অবশ্যই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অনুসরণ করে হতে হবে।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক রায় বাতিল করে সংশ্লিষ্ট সব বিচারিক প্রক্রিয়া পুনরায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতির শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে যতই বিতর্কিত বা ক্ষমতাবান হোন না কেন, ন্যায়বিচারের মৌলিক অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
খবরটি শেয়ার করুন