ছবি: সংগৃহীত
মৃত্যুর তিন দিন পর দৈনিক সমকালের বরিশালের সাবেক ব্যুরো প্রধান ও সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির পরিবারের কাছে তার বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেছে সংবাদপত্রটি। গতকাল সোমবার পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী। বিষয়টি আজ মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর তার পকেট থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি চিরকুটের একটি ছিল সমকাল কার্যালয়ে থাকা তার পাওনা টাকা পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধসংবলিত। দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে লেখা ওই চিরকুটে পাওনা অর্থ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল বলে পুলিশ ও স্বজনদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে।
আজ ঢাকায় বসে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমের সঙ্গে কথা হয় সুমন চৌধুরীর। তিনি বলেন, “পুলকের স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে তার পাওনা ১০ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
এর মাত্র তিন দিন আগে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরের প্যারারা রোডে সমকাল কার্যালয়ের ভেতর থেকে ৫৭ বছর বয়সী পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ওই সংবাদপত্রের বরিশাল ব্যুরোর প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সাবেক কর্মস্থলটির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল এবং মাঝেমধ্যে তিনি সেখানে যেতেন বলে সহকর্মীরা জানিয়েছেন।
ঘটনার দিন পুলকের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে সুমন চৌধুরীকে বিষয়টি জানান। পরে সুমন কার্যালয়ে গিয়ে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে পুলককে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ দরজা খুলে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলকের ভাই দীপক চ্যাটার্জি বলেন, ২০২৩ সালের মে মাসে তাকে সমকাল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর তিনি আর কোনো স্থায়ী চাকরিতে ছিলেন না। চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি মানসিকভাবে কষ্টে ছিলেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং বেকারত্ব নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
পুলকের মৃত্যুর পর তার পকেট থেকে পাঁচটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই মেহেদি হাসান জানান, চিরকুটগুলো তার শার্টের বুক পকেটে পাওয়া যায়। চিরকুটগুলোর কয়েকটি স্ত্রী ও কন্যা, ছোট ভাই এবং সহকর্মীদের উদ্দেশে লেখা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা ও একমাত্র মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশে লেখা চিরকুটে পুলক ক্ষমা চেয়েছিলেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জির উদ্দেশে লেখা চিরকুটে স্ত্রী ও সন্তানকে দেখভালের অনুরোধ ছিল। আর সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে লেখা চিরকুটে সমকাল কার্যালয়ে থাকা পাওনা টাকা পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। মৃত্যুর পর সেই পাওনা টাকা পরিবারের হাতে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে চিরকুটে করা ওই অনুরোধটিও পূরণ হলো।
তবে চিরকুটে কী লেখা ছিল, তা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ। বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ এবং কোতোয়ালি মডেল থানার কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করার কথা জানিয়েছেন। তবে চিরকুটের সত্যতা যাচাই এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলক চ্যাটার্জি শুধু সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান ছিলেন না, বরিশালের সাংবাদিকতা অঙ্গনেরও পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি একসময় বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে দৈনিক যুগান্তরেও তিনি দীর্ঘ সময় সাংবাদিকতা করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বরিশালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল।
তার শেষ সময়ের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে থাকল সেই কর্মস্থল, যেখানে তিনি সাংবাদিকতার দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। সহকর্মীদের কাছে যাতায়াতের পরিচিত সেই কার্যালয়েই শেষবার তাকে পাওয়া গেল নিথর অবস্থায়। যে প্রতিষ্ঠানে একসময় সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও সহকর্মীদের সঙ্গে পেশাগত ব্যস্ততায় দিন কাটিয়েছেন, সেখান থেকেই তাকে শেষ বিদায় নিতে হলো।
পুলকের মৃত্যুর ঘটনায় বরিশালের সাংবাদিক সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, পেশাগত ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের কথা স্মরণ করছেন। তার মৃত্যু একই সঙ্গে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, বকেয়া পাওনা, দীর্ঘ বেকারত্ব এবং কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর আর্থিক অনিশ্চয়তার বিষয়গুলোও নতুন করে সামনে এনেছে।
পুলক চ্যাটার্জি স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জি ও একমাত্র মেয়ে প্রকৃতিকে রেখে গেছেন। তার মৃত্যুর পর পরিবারের কাছে পৌঁছেছে সমকালে তার বকেয়া পাওনা প্রায় ১০ লাখ টাকা। যে অর্থ জীবদ্দশায় তার প্রাপ্য ছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত পরিবারের হাতে গেল তার মৃত্যুর পর। আর সেই পাওনা টাকার দাবির কথা তিনি নিজেই রেখে গিয়েছিলেন মৃত্যুর আগে লেখা একটি চিরকুটে।
পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনই এখন তার মৃত্যুর বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য দেবে। তবে এরই মধ্যে পুলকের শেষ কর্মস্থল, শেষ চিরকুট এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতি বরিশালের সাংবাদিক সমাজে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
খবরটি শেয়ার করুন