ফাইল ছবি
রাজধানীতে মন্ত্রীদের চলাচলের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে তারেক রহমান সরকার। এতদিন পুলিশের এসকর্ট নিয়ে চলাচল করা ১৮ মন্ত্রী এখন থেকে রাজধানীতে সেই সুবিধা পাবেন না। কেবল ছয়জন মন্ত্রী ও একজন মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টার জন্য এই ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগ নয়; বরং সরকারি প্রটোকল সংক্ষিপ্ত করা, সীমিত জনবল ও যানবাহনের আরও কার্যকর ব্যবহার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত।
রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে নিরাপত্তার নামে কতটুকু রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রয়োজন, আর কোথায় সেই সুবিধা সীমিত করা যায়—এ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। দেশে মন্ত্রীদের এসকর্ট কমানোর সিদ্ধান্ত সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
এসকর্ট বলতে সাধারণত কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি চলাচলের সময় তার গাড়ির সামনে বা পেছনে পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা দলকে বোঝায়। সাধারণভাবে একটি এসকর্ট গাড়িতে পাঁচজনের মতো পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কাজ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে দ্রুত রাস্তা পরিষ্কার করা, জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্ধারিত গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছাতে সহায়তা করা। এটি ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নয়; নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় রাষ্ট্র প্রদত্ত একটি ব্যবস্থা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে ডিএমপি। তবে এটি শুধু রাজধানীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ঢাকার বাইরে সরকারি সফর বা বিশেষ কর্মসূচিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সব মন্ত্রীর জন্য আগের মতোই নিরাপত্তা ও এসকর্টের ব্যবস্থা থাকবে।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, সমাজকল্যাণ ও মহিলা-শিশুবিষয়ক মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার পরিকল্পনা উপদেষ্টার জন্য এসকর্ট বহাল রয়েছে। তবে কেন শুধু এই সাতজনকে রাখা হয়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সরকার প্রকাশ করেনি। পুলিশ কর্মকর্তারা শুধু বলেছেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। আগে মন্ত্রীদের নিরাপত্তায় প্রায় ১২০ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে ৩০ থেকে ৩৫ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় ৯০ জন পুলিশ সদস্যকে রাজধানীর অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে এসকর্টে ব্যবহৃত ২৫টি গাড়ির পরিবর্তে এখন মাত্র সাতটি গাড়ি ব্যবহৃত হবে। ফলে জনবল ও যানবাহনের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, জ্বালানি ব্যয় কমানো। সরকারি বহরে প্রতিদিন অসংখ্য গাড়ি চলাচল করে। এসকর্ট কমে গেলে জ্বালানির ব্যবহারও কমবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশের যানবাহনের সীমাবদ্ধতা। রাজধানীর মতো বড় শহরে টহল, অপরাধ দমন, জরুরি সেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে প্রতিনিয়ত গাড়ির প্রয়োজন হয়। এসকর্টে কম গাড়ি ব্যবহারের ফলে সেই যানবাহন এখন জনসেবামূলক কাজে ব্যবহার করা যাবে। তৃতীয়ত, সীমিত জনবলকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরও একটি বিষয় এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সরকার অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল কমিয়ে তুলনামূলকভাবে সরল প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা বজায় রেখেও অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা কমানো সম্ভব। এই সিদ্ধান্ত সেই নীতিরই একটি প্রতিফলন।
এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নিজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রশাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জানা গেছে, আগে প্রধানমন্ত্রীর বহরে পুলিশের অতিরিক্ত প্রটোকল গাড়ি থাকলেও এখন সেই ব্যবস্থা সীমিত করা হয়েছে। তার নিরাপত্তায় বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশের পক্ষ থেকে কেবল মোটরসাইকেলে একটি ছোট পাইলট দল দায়িত্ব পালন করছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রটোকল কমানোর এই উদ্যোগ অন্য মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজধানীর সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও সিদ্ধান্তটির একটি তাৎপর্য রয়েছে। এসকর্ট বহর চলাচলের সময় অনেক ক্ষেত্রে সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ব্যস্ত মোড়ে অন্য যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হয়। যদিও সব ক্ষেত্রে তা ঘটে না, তবে নিয়মিত এসকর্টের সংখ্যা কমে গেলে যান চলাচলে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসকর্ট কমানোর সিদ্ধান্ত যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি পরিষ্কার করা। কারণ সব মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি এক নয়। পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, বিদ্যুৎ বা জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। তাই নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তি যত বেশি স্বচ্ছ হবে, সিদ্ধান্তটি নিয়ে জনমনে তত বেশি আস্থা তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মন্ত্রীদের জন্য স্থায়ী এসকর্ট কোনো সাধারণ নিয়ম নয়। বিবিসি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ মন্ত্রী দৈনন্দিন কাজে পুলিশ এসকর্ট ব্যবহার করেন না। কেবল প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হয়। পরিস্থিতি বদলালে সেই ব্যবস্থাও পরিবর্তিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হয়। সব মন্ত্রিপর্যায়ের কর্মকর্তা স্থায়ী এসকর্ট পান না। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো হুমকির মাত্রা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষা দেয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদধারী কর্মকর্তা বিশেষ নিরাপত্তা পেলেও সেটি পদমর্যাদার কারণে নয়; সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও নর্ডিক দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চর্চা দেখা যায়। সেখানে অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল এড়িয়ে সরকারি সম্পদের দক্ষ ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দেশের নতুন সিদ্ধান্তও যদি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন, ব্যয় সাশ্রয় এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিকে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এ জন্য সবচেয়ে জরুরি হবে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া।
ডিএমপির প্রোটেকশন বিভাগের কর্মকর্তারাও বলেছেন, এসকর্ট কমানোর ফলে শুধু জ্বালানি ব্যয় নয়, গাড়ি ও জনবলের ওপর চাপও কমবে। একই সঙ্গে রাজধানীর নিয়মিত পুলিশি কার্যক্রমে এসব সম্পদ ব্যবহার করা সম্ভব হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, টহল জোরদার এবং নাগরিক সেবায় অতিরিক্ত জনবল যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সব মিলিয়ে ১৮ মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ব্যয় কমানোর চেষ্টা, সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল হ্রাস, রাজধানীর যানজট কমানোর প্রচেষ্টা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রয়োজনভিত্তিক করার একটি নীতিগত বার্তা। উন্নত বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে যেমন নিরাপত্তা সুবিধা পদমর্যাদার চেয়ে ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে, বাংলাদেশও যদি সেই নীতির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, তবে এই সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এখন নজর থাকবে, এই উদ্যোগ কেবল মন্ত্রীদের এসকর্ট কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সরকারি প্রটোকল সংস্কারের আরও বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে।
খবরটি শেয়ার করুন