ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিন পাওয়ার ঘটনাকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরে দৈনিক প্রথম আলো অবশেষে আওয়ামী লীগের কারাবন্দী নেতাদের জামিনের প্রশ্নে সরব হয়েছে।
দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত ‘ঢালাও মামলা: ন্যায়বিচারের স্বার্থে জামিন নিশ্চিত করুন’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের নেতাদের ক্ষেত্রে জামিন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
২০২৪ সালে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রায় ২০ মাস ধরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন—এমন বাস্তবতার মধ্যেই এই সম্পাদকীয় প্রকাশিত হলো। ফলে এটি শুধু একটি মতামত নয়; বরং একটি সময়োচিত সম্পাদকীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথম আলোর আজকের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, “২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনায় হওয়া মামলায় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তার দ্রুত জামিন পাওয়ার ঘটনা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই একই নীতি কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে? এর উত্তর হচ্ছে ‘না’।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রথম আলো বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক অসাম্য সামনে এনেছে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান—এই নীতি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
একই ধারাবাহিকতায় সম্পাদকীয়তে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, “সম্প্রতি আরও একটি হত্যা মামলায় কারাবন্দী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে তাকে মোট ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। এভাবে একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।”
এটি দেশে বহুল আলোচিত ‘এক মামলা থেকে মুক্তি, আরেক মামলায় গ্রেপ্তার’—এই চক্রের বাস্তব প্রতিফলন, যা কার্যত জামিনের অধিকারকে অকার্যকর করে দেয়।
প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে যে মূল নীতিটির বিষয়ে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তা হলো: “বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিন কোনো দয়া বা করুণা নয়; এটি একটি মৌলিক আইনি অধিকার। একজন ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের চোখে নির্দোষ।” বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতিটি শুধু আইনগত নয়, মানবাধিকারেরও মৌলিক ভিত্তি।
তবে সম্পাদকীয়তে যে নীতি উচ্চারিত হয়েছে—জামিন একটি মৌলিক অধিকার—তা নতুন কোনো উপলব্ধি নয়। এটি বহুদিনের স্বীকৃত আইনি সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরা গ্রেপ্তার হন ঢালাও মামলায়।
তখন প্রথম আলো কেন একইভাবে সোচ্চার হয়নি? যদি তখনও জামিন মৌলিক অধিকার হয়ে থাকে—যা বাস্তবেই ছিল—তাহলে সেই সময় আওয়ামী লীগের নেতাদের জামিনের প্রশ্নে পত্রিকাটি নীরব ছিল কেন? আজ যে যুক্তি দিয়ে জামিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে, সেই একই যুক্তি কি তখন প্রযোজ্য ছিল না?
এই প্রশ্নগুলো শুধু সমালোচনা নয়; বরং কোনো গণমাধ্যমের নীতিগত ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের অংশ। কারণ একটি পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার অবস্থানের ধারাবাহিকতার ওপর।
পাঠকদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, প্রথম আলো সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে একচেটিয়া সমর্থন করেছে। যদিও একই সময়ে পত্রিকাটির কার্যালয় আক্রমণের শিকার হয়েছিল—যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক—তবুও সম্পাদকীয় অবস্থানে সেই সময়ের নীরবতা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
একটি নিরপেক্ষ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের দায়িত্ব কেবল ঘটনার বিশ্লেষণ নয়; বরং ন্যায় ও অন্যায়ের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। সেই অবস্থান হতে হয় সময়নিরপেক্ষ, ক্ষমতানিরপেক্ষ এবং ব্যক্তি-নিরপেক্ষ।
যে নীতির কথা আজ বলা হচ্ছে, তা সব সময়ের জন্যই সত্য। সেই নীতির প্রয়োগেও ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি। সম্পাদকীয় বিভাগকে তাই শুধু বর্তমান নয়, অতীতের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকতে হয়। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো ‘নির্বাচিত সময়’ থাকা উচিত নয়।
প্রথম আলোর আজকের সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, “২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোয় দেখা গেছে, অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি ছাড়াই অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দীর্ঘদিন কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। এতে শুধু ব্যক্তি নন, তার পরিবার ও সামাজিক অবস্থানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, “ঢালাও মামলার অন্যতম বড় সমস্যা হলো, এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকৃত অপরাধী বা সরাসরি গুলির নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্বল বা ভিত্তিহীন, তারাই কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। এই বাস্তবতা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।”
একই সঙ্গে প্রথম আলো পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে: “মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেটা ঘটেনি।” সম্পাদকীয়তে সুপারিশ করা হয়েছে, যাচাই–বাছাই করে দ্রুত জামিন প্রদান করা উচিত এবং এ ক্ষেত্রে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
এছাড়া বলা হয়, “এখন যেহেতু নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তাই জনগণের প্রত্যাশা—এই সমস্যার একটি ন্যায়সংগত সমাধান হবে। নতুন বাস্তবতায় প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে সমঝোতার রাজনীতির দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মামলার তদন্তপ্রক্রিয়া দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে।”
এবং, “ফৌজদারি কার্যবিধিতেও মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরপরাধ মানুষকে আসামি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।”
সবশেষে সম্পাদকীয়তে বলা হয়, “ঢালাও মামলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে… আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও মানবিকতা দুটিই সমান জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মিলিয়ে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় দেশের বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক সমস্যাকে সামনে এনেছে এবং জামিনের অধিকারকে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে একই সঙ্গে এটি একটি আত্মসমালোচনার সুযোগও তৈরি করেছে—গণমাধ্যমের জন্য, এবং বিশেষ করে প্রথম আলোর জন্য।
ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ধারাবাহিকতা, নিরপেক্ষতা এবং সাহস—এই তিনটি গুণই সম্পাদকীয়কে শক্তিশালী করে তোলে। আলোচ্য সম্পাদকীয় সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ—এখন প্রয়োজন সেই অবস্থানকে সময়ের সব প্রেক্ষাপটে সমানভাবে ধরে রাখা।
খবরটি শেয়ার করুন