ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং চীনকে বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে মূল্যবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত (মরক্কো) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাবলিক ডিপ্লোমেসি উইংয়ের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন আল রশীদ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তারেক রহমানের চীন সফর ছিল ভারতের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক বার্তা এবং বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের’ প্রতিফলন দেখছেন।
‘তারিক রহমান অ্যানসার্ড ইন্ডিয়াস গুডউইল বাই ভিজিটিং চায়না, সেজ এক্স-বাংলাদেশ এনভয়’ শিরোনামের সাক্ষাৎকারটি ৭ জুলাই দ্য প্রিন্ট-এ প্রকাশিত হয়। পরে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে মোহাম্মদ হারুন আল রশীদ জানান, সাক্ষাৎকারটি ই-মেইলের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
সাক্ষাৎকারে হারুন আল রশীদ দাবি করেন, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি মূলত সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সময় অনুসৃত নীতির ধারাবাহিকতা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই নীতির মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার প্রতি সন্দেহ ও বিরূপ মনোভাব তৈরি করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে দেশের ইসলামপন্থী মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রশীদ ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মরক্কোয় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব ছাড়েন এবং পরে কানাডায় চলে যান। সেখানে তিনি ফেসবুকে একটি পোস্টে ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেন। ওই পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার উগ্রবাদী শক্তিকে সুযোগ দিয়েছে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। রশীদের দাবি, বাংলাদেশের এসব মৌলবাদী শক্তি আবেগগত ও রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে আছে। তার মতে, এসব গোষ্ঠী এমনভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, ক্ষমতাসীন সরকারকে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী বা ভারতের স্বার্থবিরোধী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করতে হয়।
মরক্কোতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হারুন আল রশিদকে ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর দেশে ফিরে ‘অনতিবিলম্বে’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নানা অজুহাতে দেশে ফেরা বিলম্বিত করে তিনি চলে যান কানাডায়। সেখান থেকেও ফেসবুকে এক পোস্টে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। তিনি নিজের ফেসবুকে লেখেন, ‘ড. ইউনূসের অধীনে নৈরাজ্যের পথে ধাবিত বাংলাদেশ—বিশ্বের নীরবতা বেদনাদায়ক’।
ঢাকায় না এসে কানাডায় চলে যাওয়া বাংলাদেশের এই পেশাদার কূটনীতিক বলেনন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈধ সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।’ দ্য প্রিন্ট-এ প্রকাশিত সাবেক কূটনীতিক মোহাম্মদ হারুন আল রশীদের সাক্ষাৎকারটি মূলত দেশের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি, ভারত-চীন সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি নিয়ে তার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণকে তুলে ধরেছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে ভারতের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস’ কাজ করছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে চলমান কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কেও নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
সাবেক এই কূটনীতিকের দাবি, বাংলাদেশের কিছু মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি আবেগগত ও রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে রয়েছে। তার মতে, এসব গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ভারতবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে এসেছে এবং সেই মনোভাব এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে ক্ষমতাসীন সরকারকে ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃশ্যমানভাবে জোরদার করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, তার দৃষ্টিতে তারেক রহমানের চীনমুখী কূটনীতি সেই রাজনৈতিক বাস্তবতারই বহিঃপ্রকাশ।
হারুন আল রশীদের মূল্যায়নে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ ১৭ বছর অবস্থানের পর দেশে ফেরার পর ভারত সরকারই সবচেয়ে বেশি আন্তরিকতা দেখিয়েছিল। তিনি উদাহরণ হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে পরিবারসহ ভারত সফরের আমন্ত্রণ, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ এবং ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বিষয় উল্লেখ করেন।
তার মতে, ভারতের এই ইতিবাচক বার্তার বিপরীতে তারেক রহমানের প্রথম বড় পররাষ্ট্র সফর চীনে হওয়া এবং সেখানে চীনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা কেবল কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং নয়াদিল্লির উদ্দেশে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত। তিনি বলেন, ভারতের শুভেচ্ছার জবাব তারেক রহমান চীন সফরের মাধ্যমে দিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে পাকিস্তান প্রসঙ্গেও বিস্তারিত বক্তব্য দেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি নতুন নয় এবং আওয়ামী লীগও অতীতে সেই নীতি অনুসরণ করেছে। তবে তার দাবি, আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তার মতে, সরকারকে চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশকে নিয়ে একটি কৌশলগত অক্ষ গড়ে তোলার জন্য ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, শুধু নীতিনির্ধারণী মহল নয়, কিছু প্রভাবশালী শিক্ষাবিদও সরকারকে পাকিস্তানের আরও কাছাকাছি যাওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন হারুন আল রশীদ। তার দাবি, তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির পেছনেও ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাব কাজ করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন একটি ধারণা রয়েছে যে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে সক্রিয় মৌলবাদী শক্তিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যেও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চলছে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাস্তবে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়াতে হলে সেখান থেকে বেশি অস্ত্র কিনতে হবে, যা বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, এটি ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর কৌশল নয়; বরং দেশের একটি ভারতবিরোধী শ্রোতাগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা।
দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে ভারতীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের আটকে দেওয়া এবং পরে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের বিষয়টিও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। হারুন আল রশীদ বলেন, তার দৃষ্টিতে এটি বড় ধরনের কোনো কূটনৈতিক সংকট নয়। বরং ঘটনাটি জাহেদ উর রহমানের জন্যই বেশি বিব্রতকর। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, জাহেদ উর রহমান এবং বাংলাদেশের কয়েকজন জনপ্রিয় ইউটিউবার দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছেন এবং সেই প্রচারণার বড় অংশ তার দাবি অনুযায়ী তথ্যভিত্তিক নয়।
ভারতে অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতে যান, তবে তাদের যাওয়ার কারণ ভিন্ন। তার দাবি, হিন্দুরা নির্যাতন বা চাপের মুখে দেশ ছাড়েন, আর মুসলমানদের বড় অংশ অর্থনৈতিক কারণে ভারতে যান। যদিও বাংলাদেশের ধারাবাহিক সরকারগুলো অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশিদের ভারতে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে এসেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও এই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কেও কঠোর মন্তব্য করেন হারুন আল রশীদ। তার দাবি, দেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এই প্রবণতা পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের একটি অংশের রাজনীতি সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভারতবিরোধী অবস্থানকে উৎসাহিত করে, যা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক নয়।
দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন সাবেক এই কূটনীতিক। তার মতে, ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ ও ভারত আদর্শ প্রতিবেশী হওয়ার সব উপাদানই ধারণ করে। এমনকি তার মতে, পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি হলে দুই দেশের মধ্যে মানুষের চলাচলও আরও সহজ হতে পারত। কিন্তু তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে ভারতবিরোধী প্রচারণা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির ছড়ানো অপপ্রচার সেই সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
হারুন আল রশীদের এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত অভিযোগ, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নগুলো সম্পূর্ণভাবে তার ব্যক্তিগত মতামত ও দাবি। সাক্ষাৎকারে এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাহেদ উর রহমান কিংবা আলোচনায় আসা অন্য ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে সাক্ষাৎকারে করা বিভিন্ন অভিযোগ ও মূল্যায়নের স্বাধীন বা নিরপেক্ষ যাচাই সেখানে উপস্থাপিত হয়নি। সে কারণে এগুলোকে সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব বিশ্লেষণ ও অবস্থান হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
খবরটি শেয়ার করুন