ভূমিকম্পে বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি: ইপিএ
পানামার দক্ষিণাঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার হওয়া এ ভূমিকম্পে কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূপৃষ্ঠের ১২ দশমিক ৬ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি। উপকেন্দ্র ছিল রাজধানী থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের জনবিরল এলাকায়। ভূমিকম্পে হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানা যায়, ভূমিকম্পের পর কয়েক ঘণ্টায় পানামায় ৪০ টির বেশি আফটারশক অনুভূত হয়। পানামা খাল ও কোবরে পানামা তামার খনিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলার কথা জানানো হয়েছে। টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলের ওপর দেওয়া স্থগিতাদেশও তুলে নেওয়া হয়।
ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। রাজধানী পানামা সিটির অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকার অফিসকর্মীরা যানজটের মধ্যে বাড়ি ফেরা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৩৭ বছর বয়সী কর্মী হুয়ান সানচেজ বাসের অপেক্ষায় ছিলেন। বাস আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। হুয়ান সানচেজ বলেন, ‘এখানকার সব ভবন খালি করে দেওয়া হয়েছে। সবাই বাইরে। এখন সমস্যা হলো, আমরা বাড়ি ফিরব কীভাবে?’
ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ও পানামা সিটির মাঝামাঝি পেনোনোমে শহরে যান প্রেসিডেন্ট রাউল মুলিনো। সেখানে কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে এবং একটি গির্জা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত জুনে ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি ভূমিকম্পে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আগস্টে কলম্বিয়ায় একটি ভূমিকম্পে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
ইউএসজিএসের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা জনসংখ্যাবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানামার প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে ভূমিকম্পের প্রভাব অন্তত গুরুতর পর্যায়ের হতে পারে। তুলনায় ভেনেজুয়েলায় পরপর আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্পের এলাকায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এবং পশ্চিম কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৬ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করতেন।
পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নেস্তর লুকের মতে, আজুয়েরো-সোনা ফল্ট সিস্টেমের কারণে এ ভূমিকম্প হয়েছে। তার ভাষ্য, এই ফল্ট সিস্টেমে বিপুল চাপ জমে থাকে, যা মাঝেমধ্যে মুক্ত হয়। তিনি আরও বলেন, ‘ভূকম্পনের সংকেত পুরো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণেই সব জায়গায় কম্পন অনুভূত হয়েছে।’
পানামা সিটিতে প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভব করেছেন বলে জানান নেস্তর লুকে। অন্য কিছু এলাকায় কম্পন আরও দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হয়ে থাকতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পানামা সিটির পুরোনো একটি ভবনের ষষ্ঠ তলায় ছিলেন সাবিনা রিওস। ভবনটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির সময়কার। সাবিনা রিওস বলেন, ‘ভূমিকম্পটি বেশ শক্তিশালী ছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। বহু বছরের মধ্যে এত দীর্ঘ সময় ধরে কম্পন অনুভব করিনি।’
৪৮ বছর বয়সী রক্ষণাবেক্ষণকর্মী ভিক্টর পিনজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি উঁচু ভবনের জানালা পরিষ্কার করা কর্মীদের দুলতে দেখেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘তারা মারা যাননি, এটা অলৌকিক ঘটনা। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন দোলনায় দুলছেন।’
পানামায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা খুব একটা ঘটে না। ভূমিকম্পের পর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রাস্তায় বেরিয়ে আসা কয়েকজন বয়স্ক বাসিন্দাকে কাঁদতে দেখা যায়। দক্ষিণ পানামার হেরেরা প্রদেশের ৭৪ বছর বয়সী রিকার্ডো ব্রাউন বলেন, ‘আমরা ভয়ে আছি। এখানে আমরা দুজন বয়স্ক মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই। বাড়িতে ফাটল ধরেছে। ভয় হচ্ছে, এটি আমাদের ওপর ভেঙে পড়তে পারে।’
এলাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখেছেন বলেও জানান রিকার্ডো ব্রাউন।
পানামার বেসামরিক সুরক্ষা সংস্থার প্রধান ওমর স্মিথ সংবাদমাধ্যম টেলিমেত্রো রিপোর্টাকে বলেন, হেরেরা প্রদেশের রাজধানী চিত্রে এবং লস সান্তোস প্রদেশের উপকূলীয় এলাকাতেও ভূমিকম্পের প্রভাব পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইউএসজিএসের হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে পানামার মোট দেশজ উৎপাদনের ১ থেকে ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাতুরজি জানিয়েছে, ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন