শনিবার, ২৪শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৪০৭ বিদেশি, সাজা শেষে ফেরার অপেক্ষায় ১৭২ *** সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত, রিসোর্টের ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল *** দ্রুততম মানব ইমরানুর, মুকুট ধরে রাখলেন শিরিনও *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণে সহায়তা করেছিলেন মাদ্রাসাশিক্ষকের স্ত্রী, গ্রেপ্তার *** কোনো কিছুই পক্ষে নেই, কেন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সৌদি যুবরাজ *** ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন’ জানিয়ে নওগাঁয় মাইকিং *** ছাত্রীকে যৌন হয়রানির খবরে মহিলা মাদ্রাসায় আগুন, শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদরাসা শিক্ষক পলাতক *** টঙ্গীতে শিশুকে যৌন নিপীড়ন: মাদ্রাসাশিক্ষককে থাপ্পড়ের ভিডিও ভাইরাল, থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ *** বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের আগে সুখবর দিল বিসিবি

সুখবর এক্সপ্লেইনার

বিশ্বকাপে সৌদি আরবের পতাকা যে কারণে মাটিতে রাখা হয় না

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ১১:৪৪ অপরাহ্ন, ২১শে জুন ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

খেলাধুলার আন্তর্জাতিক আসরগুলোতে জাতীয় পতাকা শুধু একটি দেশের পরিচয় নয়, বরং জাতীয় গৌরব, ইতিহাস ও মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। তবে বিশ্বের প্রায় সব দেশের পতাকা যেখানে মাঠের ঘাসে বিছিয়ে প্রদর্শন করা যায়, সেখানে সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা নিয়ে রয়েছে ব্যতিক্রমী নিয়ম। ফিফা বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্বকারী দলের ম্যাচের আগে সেই ব্যতিক্রম আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে।

সাধারণত ফিফার নতুন ম্যাচ-পূর্ব প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী দুই দলের বড় আকারের জাতীয় পতাকা মাঠের মাঝখানে ঘাসের ওপর বিছিয়ে ধরা হয়। খেলোয়াড়, রেফারি ও আয়োজকেরা বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর স্বেচ্ছাসেবকেরা পতাকার চারপাশে অবস্থান নেন। কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে এই প্রচলিত রীতিতে পরিবর্তন আনে ফিফা।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচের আগে সৌদি আরবের পতাকা মাঠে বিছিয়ে না রেখে কয়েক স্বেচ্ছাসেবক হাতে ধরে উঁচু করে প্রদর্শন করেন। একইভাবে স্পেনের পতাকাও উঁচু করে ধরা হয়। ফিফার এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল সৌদি আরবের জাতীয় পতাকায় থাকা ইসলামের পবিত্র কালেমার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি।

সৌদি আরবের জাতীয় পতাকার সবুজ পটভূমিতে আরবি ভাষায় লেখা রয়েছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’—ইসলামের ঈমানের মূল ঘোষণা বা শাহাদাহ। এর নিচে রয়েছে একটি সাদা তলোয়ারের প্রতীক, যা দেশটির ঐতিহাসিক ঐক্য ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এই ধর্মীয় ঘোষণার কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষ মনে করে, পতাকাটি কখনো মাটিতে, পানিতে, বা এমন কোনো স্থানে রাখা উচিত নয়, যেখানে তা অসম্মানিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা বিশ্বের খুব কম সংখ্যক পতাকার একটি, যার সঙ্গে ধর্মীয় পবিত্রতার প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত। ফলে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অনুসরণ করে আসছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি অতীতে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সৌদি আরবের পতাকায় ইসলামের পবিত্র কালেমা থাকার কারণে দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান মেনে চলে। এমনকি জাতীয় শোকের সময়ও সৌদি পতাকা অর্ধনমিত করা হয় না। কারণ, কালেমা খচিত পতাকাকে নিচে নামানো ধর্মীয়ভাবে অনুচিত বলে মনে করা হয়।

সৌদি আরবের ১৯৭৩ সালের জাতীয় পতাকা আইনেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ওই আইনে বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকা কোনোভাবেই অপমান, অবমাননা বা অসম্মানের শিকার হতে পারে—এমন অবস্থানে রাখা যাবে না। পতাকা মাটিতে ফেলা, মুদ্রিত পণ্যে ব্যবহার কিংবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

এ কারণে অতীতেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে সৌদি পতাকা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক ও আলোচনা দেখা গেছে। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের আগে আয়োজকেরা অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পতাকা দিয়ে প্রচারমূলক ফুটবল তৈরি করেছিল। কিন্তু সৌদি আরব আপত্তি জানায়। কারণ, খেলোয়াড়েরা পায়ে আঘাত করে এমন ফুটবলে কালেমা খচিত পতাকা ব্যবহার করা তাদের কাছে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পরে আয়োজকেরা সৌদি আরবের উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ২০০৬ সালের বিশ্বকাপেও। বিভিন্ন প্রচারসামগ্রী ও স্মারকপণ্যে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সৌদি আরব বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সে সময় লিখেছিল, সৌদি পতাকা অন্য অনেক জাতীয় প্রতীকের মতো শুধু রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি ধর্মীয় সংবেদনশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বিশ্বকাপ ফুটবলে ফিফার সিদ্ধান্তকে অনেক পর্যবেক্ষক ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। সৌদি আরব ফুটবল ফেডারেশন ফিফাকে জানায়, নতুন ম্যাচ-পূর্ব প্রোটোকল অনুযায়ী পতাকা মাঠের ঘাসে বিছিয়ে প্রদর্শন করলে তা তাদের জাতীয় ও ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এরপর ফিফা বিষয়টি পর্যালোচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

তবে শুধু সৌদি আরবের পতাকা উঁচু করে প্রদর্শন করা হলে প্রতিপক্ষ দেশের প্রতি অসম্মান দেখানোর অভিযোগ উঠতে পারত। সে কারণেই ফিফা উভয় দেশের পতাকাকে একইভাবে হাতে ধরে প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে একদিকে সৌদি আরবের ধর্মীয় সংবেদনশীলতা রক্ষা হয়েছে, অন্যদিকে দুই দেশের মধ্যে সমতা ও কূটনৈতিক সৌজন্যও বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

ফুটবলের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি অতীতেও এ ধরনের নমনীয়তা দেখিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই ইরাকের পতাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ইরাকের জাতীয় পতাকায় আরবি ভাষায় ‘আল্লাহু আকবার’ লেখা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে দেশটির অনুরোধের পর আয়োজকেরা পতাকা ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছিল, যাতে ধর্মীয় শব্দগুচ্ছের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের অভিযোগ না ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক ক্রীড়া আয়োজন শুধু প্রতিযোগিতা নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতীয় পরিচয়ের সহাবস্থানেরও একটি ক্ষেত্র। ফলে আয়োজকদের প্রায়ই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা সব অংশগ্রহণকারীর মূল্যবোধকে সম্মান জানায়।

একই ধরনের মন্তব্য করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাও। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুসলিম বিশ্বের বহু মানুষের কাছে সৌদি পতাকায় থাকা শাহাদাহ শুধু একটি জাতীয় প্রতীক নয়; এটি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ। ফলে পতাকাটির ব্যবহারে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রদর্শনকে তারা স্বাভাবিক ও যৌক্তিক বলে মনে করেন।

অবশ্য সমালোচকেরাও আছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে সব দেশের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তবে ফিফা ও অন্যান্য ক্রীড়া সংস্থার যুক্তি হলো, কোনো দেশের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা যদি সহজে সম্মান করা সম্ভব হয় এবং তাতে অন্য দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করাই যুক্তিযুক্ত।

বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন ক্রমেই আরও বহুসাংস্কৃতিক হয়ে উঠছে। একেক দেশের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও জাতীয় প্রতীক ব্যবহারের রীতি ভিন্ন। সেই বাস্তবতায় সৌদি আরবের পতাকা নিয়ে ফিফার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রোটোকল পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি দেখিয়েছে, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে কীভাবে সম্মান জানানো হচ্ছে।

ফুটবল মাঠে কয়েক মিনিটের একটি পতাকা প্রদর্শন অনুষ্ঠান হয়তো অনেকের কাছে তুচ্ছ বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু সেই ছোট্ট আয়োজনই কখনো কখনো একটি দেশের বিশ্বাস, পরিচয় ও মূল্যবোধের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের পতাকা মাটিতে না রাখার পেছনের গল্পও মূলত সেই সম্মান, বিশ্বাস ও প্রতীকের গুরুত্বের গল্প।

সৌদি আরবের পতাকা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250