ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখা এবং পরে ক্ষুব্ধ হয়ে তার ভারত সফর বাতিল করে দেশে ফিরে আসার ঘটনাটি দুই দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঘটনাটি কেবল একজন উচ্চপদস্থ সরকারি প্রতিনিধির বিমানবন্দরে হয়রানির অভিযোগ নয়; বরং এর পেছনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কূটনীতির নানা স্তর জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন’ (আইওআরএ)-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ১৪ জুন দিল্লি যান জাহেদ উর রহমান। সফরের বিষয়ে দুই দিন আগেই দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিল।
শুধু লিখিত নোট ভারবালই নয়, হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল বলে কূটনৈতিক সূত্র সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে।
কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়। বিমানবন্দরের অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে আটকে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বাংলাদেশি কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, কোনো স্পষ্ট কারণ না দেখিয়েই তাকে অপেক্ষা করানো হয়। পরবর্তীকালে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপের পর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভারতীয় এবং বাংলাদেশি সূত্র ঘটনাটির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-নিউজ১৮-এর বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাহেদের নাম ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি ওয়াচলিস্টে ছিল। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের সময় তার নাম শনাক্ত হওয়ায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে সাময়িকভাবে আটকে রাখেন। পরে যাচাই-বাছাই শেষে বিষয়টি ‘প্রশাসনিক ত্রুটি’ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
এখানেই শুরু হয়েছে প্রশ্ন। একজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অতিথি, যার সফর সম্পর্কে আগে থেকেই ভারত সরকারকে জানানো হয়েছিল, তার নাম কীভাবে নিরাপত্তা নজরদারি তালিকায় থেকে যায়? যদি সত্যিই এটি প্রশাসনিক ভুল হয়ে থাকে, তবে ভারতের মতো একটি দেশের সমন্বিত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ব্যবস্থায় এমন ভুল কীভাবে ঘটল?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে ওয়াচলিস্ট সাধারণত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। কোনো ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা প্রথমে তাকে থামিয়ে যাচাই করেন। কিন্তু কূটনৈতিক সফরে আসা কোনো প্রতিনিধির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগেই তালিকা পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য জটিলতা দূর করে থাকে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সত্যিই প্রশাসনিক ভুল, নাকি যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যর্থতা?
আরও একটি তথ্য বিষয়টিকে জটিল করেছে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার, ইউটিউবার এবং অ্যাকটিভিস্টের বিরুদ্ধে ভারতবিরোধী প্রচারণার অভিযোগ ওঠে। সে সময় ভারত কয়েকটি অনলাইন চ্যানেল ব্লক করে। ডা. জাহেদ উর রহমানের নামও সেই নজরদারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল বলে ভারতীয় সূত্রের দাবি।
যদিও এ বিষয়ে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি, তবে এই দাবি সত্য হলে তা আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে। একজন ব্যক্তি পরে রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও যদি তার নাম পুরোনো কোনো নিরাপত্তা তালিকায় থেকে যায়, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতারই প্রমাণ।
ঘটনার আরেকটি বিতর্কিত দিক হচ্ছে ভিসা ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত ব্যাখ্যা। কিছু ভারতীয় সূত্র দাবি করেছে, জাহেদ উর রহমান সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন এবং তার কাছে ভারতীয় ভিসা ছিল না। আবার অন্য সূত্র বলছে, তার পাসপোর্টে সার্ক ভিসা স্টিকার ছিল এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের আনুষ্ঠানিক নোট ভারবাল থাকায় প্রবেশে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না।
বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে ছিলেন এবং প্রটোকল অনুযায়ী তার সফর সম্পর্কে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছিল। ফলে সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করলেও তার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়ার কথা ছিল।
ঘটনার সময়কালও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র কয়েক দিন আগে জাহেদ উর রহমান প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই অতীতের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায়। সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু নিয়েও তিনি তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছিলেন এবং এটিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কৌশল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গেই কয়েক দিনের ব্যবধানে দিল্লি বিমানবন্দরে এই ঘটনা ঘটায় রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
অনেকে মনে করছেন, এটি হয়তো শুধু একটি প্রশাসনিক বিভ্রাট। আবার অন্যরা বলছেন, এটি ছিল ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত সতর্কতার ফল। তবে আরও একদল বিশ্লেষক এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
কারণ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘ সময় অস্বস্তিকর অবস্থায় ছিল। যদিও ২০২৬ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। এ বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরে তাকে বিমানবন্দরে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। একই সফরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের বার্তাও দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া মার্চ মাসে বাংলাদেশের ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফরও নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল। উভয় দেশই পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে জাহেদ উর রহমানের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিমানবন্দর জটিলতা নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ—সেটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কূটনৈতিক মহলের অভিমত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতীকী ঘটনাও অনেক সময় বাস্তব প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে একজন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিকে বিমানবন্দরে আটকে রাখা এবং পরে তার সফর বাতিল হয়ে যাওয়া দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তির জন্ম দিতে পারে। যদিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত তাকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি বদলে যায়। জাহেদ উর রহমানের সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট—যে পরিবেশে তাকে প্রথমে স্বাগত জানানো হয়নি, সেখানে তিনি আর সফর চালিয়ে যেতে চাননি।
বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সবকিছু পরিষ্কার হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরের এই ঘটনা এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। জাহেদ উর রহমান কি সত্যিই পুরোনো কোনো নিরাপত্তা তালিকার কারণে আটকা পড়েছিলেন? ভারতীয় প্রশাসনের মধ্যে কি সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল? নাকি এটি ছিল কূটনৈতিক প্রটোকল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংঘাতের একটি বিরল উদাহরণ?
আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা ব্যাখ্যা ছাড়া এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, একজন উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশি প্রতিনিধির সফর মাঝপথে ভেঙে যাওয়ার ঘটনাটি শুধু বিমানবন্দরের একটি প্রশাসনিক ভুল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, পারস্পরিক আস্থার মাত্রা এবং দুই দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভবিষ্যতে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ব্যাখ্যা দেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই ঘটনাকে ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে—একটি সাময়িক ভুল হিসেবে, নাকি কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরে থাকা অস্বস্তির একটি প্রকাশ হিসেবে।
খবরটি শেয়ার করুন