ফাইল ছবি
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতিতে গত সপ্তাহে একই সময়ে আবার আলোচনায় এসেছেন মিয়ানমারের অং সান সু চি ও বাংলাদেশের শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত থাকার পর কয়েক দিনের ব্যবধানে তাদের প্রকাশ্যে আসার ঘটনা নিজ নিজ দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভারতের গণমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এ ১০ আগস্ট প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন রামি নিরঞ্জন দেশাই। তিনি ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন, নয়াদিল্লির ডিস্টিংগুইশড ফেলো। তার নিবন্ধটির শিরোনাম, ‘সু চি অ্যান্ড হাসিনা আর ব্যাক। সাউথ এশিয়া স্টিল কান্ট মুভ পাস্ট ইটস স্ট্রংউইমেন’।
দেশাই লিখেছেন, ৩ আগস্ট মিয়ানমারের নতুন সরকার অং সান সু চির ছবি প্রকাশ করে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার সরকারের পতনের পর থেকে সু চির বিষয়ে প্রায় কোনো তথ্যই প্রকাশ্যে আসেনি। তার স্বাস্থ্য নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নানা জল্পনা ছিল। ফলে অনেকের ধারণা হয়েছিল, মিয়ানমারের রাজনীতিতে সু চির যুগ শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু সামরিক সরকারের অনুমোদনে তার ছবি প্রকাশের ঘটনাকে দেশাই পরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সরকারের প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য ছিল নির্বাচন আয়োজন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন।
দেশাইয়ের মতে, সু চিকে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় দেখানো ছবির মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার দেশটির স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক পরিস্থিতির একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। একই সময়ে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা পেয়েছেন। এর আগে তিনি ভারত ও চীনও সফর করেছেন।
নিবন্ধে দেশাই সু চির রাজনৈতিক প্রভাবের দিকটিও তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, সু চি যদি মিয়ানমারের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতেন, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে আনার প্রয়োজন পড়ত না। বরং তার ছবি প্রকাশের ঘটনাই প্রমাণ করে, দেশটির রাজনীতিতে সু চির উত্তরাধিকার এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অবস্থাকেও একই ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন দেশাই। ৫ আগস্টের ঘটনার পর ২০২৪ সাল থেকে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা ৫ আগস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। দেশাই লিখেছেন, বাংলাদেশের বাইরে তার বক্তব্যটি দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়। তবে বাংলাদেশে তা প্রচার করা হয়নি।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রায় ১৬ বছর দেশ শাসন করেছেন। তার সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে, অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে আরও দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি হয়েছে। দেশাই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়াকে তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির বাইরে চলে যাননি বলে তার বক্তব্য। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কথা উল্লেখ করে দেশাই জানান, শেখ হাসিনা ওই রায়কে আইনগতভাবে অকার্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
দেশাইয়ের মতে, শেখ হাসিনাকে সমর্থন বা বিরোধিতা—দুই অবস্থানের ক্ষেত্রেই তার রাজনৈতিক উপস্থিতি বাংলাদেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগও মিয়ানমারের ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির মতো বিলুপ্ত হয়নি। ফলে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকছে।
নিবন্ধে ভারতকে ঘিরে দুই নেত্রীর পুনরাবির্ভাবের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। দেশাইয়ের মতে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী। দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত, জনগণের যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় রয়েছে। ফলে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব ভারতের ওপরও পড়তে পারে।
তিনি লিখেছেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো—দুই দেশের রাজনীতি এখনো এমন ব্যক্তিত্বদের প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি, যারা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। সু চি ও শেখ হাসিনার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি তাই এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় বড় প্রভাব ফেলে।
দেশাইয়ের মতে, ভারত ঐতিহাসিকভাবে বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে যেমন ভারত সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তেমনি বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সঙ্গেও কাজ করেছে। প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে এই ধারাবাহিক সম্পর্ক ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
নিবন্ধের শেষাংশে দেশাই প্রশ্ন তুলেছেন, সু চি বা শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরবেন কি না, সেটিই মূল বিষয় নয়। বরং মিয়ানমার ও বাংলাদেশ এমন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে কি না, যেখানে একজন ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে না—সেটিই বড় প্রশ্ন। তার মতে, সেই পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত সু চির একটি ছবি কিংবা শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যও দুই দেশের রাজনৈতিক কল্পনায় বড় প্রভাব ফেলতে থাকবে।
খবরটি শেয়ার করুন