ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো দেশের 'মালিক সমিতি নির্বাচিত' করাতে চাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, জাতীয় সংসদের সদস্যরা যে দেশের অলিখিত একটি মালিক সমিতি হয়ে উঠছেন, তা বেশ স্পষ্ট।
তিনি বলেন, নির্বাচিত হয়ে তারা পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। সেটা দিয়ে তারা পেয়ে যান অর্থ, বিত্ত আর প্রতিপত্তি। একটি অঞ্চলের তালুক। সেখানে তিনিই রাজাধিরাজ, আর সবাই প্রজা। তার আশঙ্কা, আগামী সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের জন্য আরেকটি 'মালিক সমিতি নির্ধারিত' হতে যাচ্ছে।
মহিউদ্দিন আহমদের আশঙ্কার তালিকায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেই। দলটি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ২০০৭ সালে এক-এগারোর অভ্যুত্থানের পথ ধরে আসা ‘সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ আমলে সাধারণ মানুষ শান্তিতে ছিলেন। একইসঙ্গে তার দাবি, দেশে কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী, সংগঠন ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের অবরোধ দিয়ে আজতক কোনো দাবি আদায় হয়েছে বলে শুনিনি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মহিউদ্দিন আহমদের অবরোধ সংক্রান্ত দাবিটি সত্য নয়। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরের মধ্যে অবরোধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিতর্কিত ও অযৌক্তিক দাবি আদায় করতে পারার রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি প্রথম বিএনপি অগ্রাহ্য করে বলেও উল্লেখ করেন মহিউদ্দিন আহমদ।
'একটা নমিনেশনের জন্য হাহাকার' শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোতে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে মহিউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন। তার এই লেখা আজ শুক্রবার (১২ই ডিসেম্বর) পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কর্তৃত্ববাদী শাসনের জোয়াল ভেঙে দেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার যে বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জাতীয় নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সবকিছুর বিবেচনায় আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখ অনুষ্ঠেয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিন লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে মহিউদ্দিন আহমদ নির্বাচনকে দেখছেন 'মালিক সমিতি নির্বাচিত' করার মাধ্যম হিসেবে।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদের সদস্যরা যে দেশের অলিখিত একটি মালিক সমিতি হয়ে উঠেছেন, তা তো বেশ স্পষ্ট। কী নেই তাদের হাতে? তাদের হাতে আছে আলাদিনের চেরাগ। সেটা দিয়ে তারা পেয়ে যান অর্থ, বিত্ত আর প্রতিপত্তি। একটি অঞ্চলের তালুক। সেখানে তিনিই রাজাধিরাজ, আর সবাই প্রজা। এ দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে আছেন ৩০০ সার্বভৌম জমিদার। এ রকম একটা অবস্থানে যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি তো থাকবেই। একটা ‘নমিনেশন’-এর জন্য তাই এত হাহাকার।
তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে যে প্রাপ্তিযোগ ঘটে, তার আকার ও প্রকার ব্যাপক ও বিশাল। এটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়া মানে স্বর্গের টিকিট না পাওয়া। এটি কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না। সে জন্য নানান কৌশল নিতে হয়। এ জন্য দলের নেতাদের যত বেশি চাপে রাখা যায়, ততই নিজেকে করে তোলা যায় গুরুত্বপূর্ণ। চাপ দিয়ে মনোনয়ন বদলে ফেলার উদাহরণও আছে।
তার মতে, মনোনয়ন পেয়ে যাওয়ার পর একটাই লক্ষ্য থাকে, জিততে হবে। যেখানে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন, সেখানে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। সেটি আর ভোটকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যথেচ্ছ চেঁচামেচি, মারামারি, খুনোখুনির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আগামী সংসদ নির্বাচন দেশের জন্য আরেকটি মালিক সমিতি নির্ধারিত হতে যাচ্ছে বলেই মনে হয়।
তিনি লেখেন, ধরা যাক, একটি দলের পক্ষে জোয়ার উঠেছে। নির্বাচনী যুদ্ধে ওই দলের জয়ের সম্ভাবনা বেশি। এটা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে ওই দলের টিকিটে নির্বাচন করলে মোক্ষলাভ হবে। এ জন্য তারা প্রচুর বিনিয়োগ করতে পিছপা হন না। একেকটি সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থীর কত খরচ হয়, তা কেবল তিনিই জানেন। টাকার অঙ্কটি দশ-বিশ-পঞ্চাশ কোটির নিচে নয় বলেই জনশ্রুতি আছে।
তিনি বলেন, এত টাকা তারা কোথায় পান, এটি একটি প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো তারা এত টাকা কেন খরচ করেন? তাদের কী লাভ? তারা তো মুখে বলছেন তারা জনগণের সেবা করতে চান। সেবা করার জন্য সংসদ সদস্য হতে হবে, আর সংসদ সদস্য না হলে জনসেবা করা যাবে না, এটা কোন কিতাবে আছে?
তিনি বলেন, ২০০৭ সালে এক-এগারোর অভ্যুত্থানের ফলে দেশে এসেছিল ‘সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, এই সরকার ছিল ষড়যন্ত্রের ফসল। ওই সময় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অনেক হয়রানির শিকার হয়েছেন। সাধারণ মানুষ কিন্তু শান্তিতে ছিলেন। ওই দুই বছর দেশে কোনো হরতাল-অবরোধ হয়নি। ২০০৯ সালে দেশে ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ কায়েম হলে আমরা আবার ওই হরতাল-অবরোধের অভ্যাসে ফিরে যাই।
খবরটি শেয়ার করুন