ছবি: সংগৃহীত
আল-জাজিরায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সঞ্চালক শ্রীনিবাসন জৈন একটি গুরুতর প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সম্প্রতি মুখোমুখি হন। জয়ের কাছে প্রশ্নটি ছিল ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালের একটি ফাঁস হওয়া অডিও কথোপকথন নিয়ে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের দাবি তার মা ও ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বিক্ষোভকারীদের গুলি করার কোনো নির্দেশ দেননি, বা হত্যার হুকুম দেননি।
বিষয়টি উল্লেখ করে ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান বলছেন, যদি ফোনালাপটি আলাদা করে, পুরো প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে (সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্তির মতো করে) এভাবে ব্যাখ্যা করা অযৌক্তিক নয় যে শেখ হাসিনা এখানে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের যে অনুমতির কথা বলেছেন, তা মূলত অগ্নিসংযোগ ও সম্পত্তির ওপর সহিংস হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য ছিল, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের জন্য নয়।
তিনি বলেন, কারণ, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওই বক্তব্য দেওয়ার আগে পুরো কথোপকথনের মূল বিষয় ছিল দেশের বিভিন্ন ভবনে হামলা। প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশের ঠিক আগমুহূর্তে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন শেখ হাসিনাকে, ‘ওরা’—যার মাধ্যমে সেই ‘সন্ত্রাসী’ বোঝানো হচ্ছে বলে মনে হয়—মোহাম্মদপুর থানার দিকে এগোচ্ছে। এতে একটি সহিংস হামলার আশঙ্কার ইঙ্গিত, এমন বোঝাতে চাচ্ছিলেন তাপস, তেমনই মনে হয়।
বার্গম্যান বলেন, এ ছাড়া প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতির কথা বলার ঠিক পরেই শেখ হাসিনা বলেন, তিনি আগে এমন নির্দেশ দেননি, কারণ তিনি ‘ছাত্রদের নিরাপত্তার কথা ভেবে’ এত দিন নিজেকে সংযত রেখেছিলেন। এতে বোঝা যায়, অন্তত এই ফোনালাপে তিনি যেভাবে ভাষা চয়ন করেছেন তাতে সচেতনভাবেই ‘ছাত্র’ ও ‘সন্ত্রাসী’—এই দুই শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য করছিলেন।
তিনি বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি আছে: শুধু এই রেকর্ডিংটিকে ধরে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না যে শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ কারণে, বিবিসি ও আল-জাজিরার তথ্যচিত্রগুলো কিছুটা বিভ্রান্তিকর হয়েছে, কারণ সেগুলোতে শেখ হাসিনা এই মন্তব্য কোনো প্রেক্ষাপটে করেছিলেন, তা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি, এবং এমন বোঝানো হয়েছে যে তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন এই ফোন আলাপে।
দৈনিক প্রথম আলোতে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ বৃহস্পতিবার (২৯শে জানুয়ারি) প্রথম আলোর বাংলা ও ইংরেজি ডিজিটাল সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির শিরোনাম ‘হাসিনা বিক্ষোভকারীদের গুলি করার নির্দেশ দেননি, জয়ের এই দাবি কতটা সত্য?’ বার্গম্যান বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচার কার্যক্রম ও বাংলাদেশ নিয়ে লিখে আসছেন।
আইসিটির বিচার-প্রক্রিয়া নিয়ে লেখালেখিকে কেন্দ্র করে আদালত অবমাননার দায়ে আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে বার্গম্যানকে দোষী সাব্যস্ত করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন সজীব ওয়াজেদ জয়। শেখ হাসিনার ছেলে জয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ওয়াশিংটন ডিসিতে তার বাড়িতে গিয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। এই অভ্যুত্থান দমনে শত শত মানুষকে হত্যা করে নিরাপত্তা বাহিনী। এই বিষয়ে জাতিসংঘ একটি হিসাব প্রকাশ করেছে। এই সহিংসতা দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন, এমন অডিও রেকর্ডের বরাতে আল জাজিরা ও বিবিসিতে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে সাক্ষাৎকারে জয় দাবি করেন, ‘ওই অডিও ক্লিপগুলো প্রেক্ষাপটের বাইরে ব্যবহার করা হয়েছে।’ তার ভাষ্য, ‘এসব নির্দেশ ছিল জঙ্গিদের হাত থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে নয়।’
ডেভিড বার্গম্যানেরও দাবি, ‘বিবিসি ও আল-জাজিরার তথ্যচিত্রগুলো কিছুটা বিভ্রান্তিকর হয়েছে, কারণ সেগুলোতে শেখ হাসিনা এই মন্তব্য কোনো প্রেক্ষাপটে করেছিলেন, তা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি, এবং এমন বোঝানো হয়েছে যে তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন এই ফোন আলাপে।’
আল জাজিরার প্রশ্নের উত্তরে জয়ের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ডেভিড বার্গম্যান প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে বলেন, এর জবাবে সজীব ওয়াজেদ জয় জোরালোভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, আল-জাজিরা ও বিবিসি—দুটিই ওই ক্লিপটির খণ্ডিতাংশ ব্যবহার করেছে, ফলে অর্থ বিকৃত হয়েছে। জয়ের ভাষায়, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) বলেন, তিনি বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন এবং সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেন।’
তিনি বলেন, জয় আরও দাবি করেন, তার মায়ের ওই নির্দেশ কেবল ‘সহিংস বিক্ষোভকারী, সশস্ত্র বিক্ষোভকারী ও সন্ত্রাসীদের’ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল।
বার্গম্যান লেখেন, যে রেকর্ডিংটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শেখ হাসিনা ও দক্ষিণ ঢাকার সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের মধ্যে হওয়া একটি ফোনালাপ। ফজলে নূর তাপস সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভাতিজা হন। কথোপকথনের শুরুতে দুজন আওয়ামী লীগ নেতা ‘সন্ত্রাসী’দের দ্বারা সম্পত্তিতে হামলার কথা বলেন। তাপস বলেন, জাতীয় সচিবালয়ে (যেখানে সরকারি মন্ত্রণালয়গুলো রয়েছে) এবং আবাহনী ক্লাবে (আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ সাবেক শাসক দলের ফুটবল ক্লাব) হামলা হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আরও কিছু ‘সংবেদনশীল বাসা বাড়িতে আক্রমণ’ হতে পারে।
তিনি বলেন, এর জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সব ধরনের জমায়েত ছত্রভঙ্গ করার ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু তাপস সতর্ক করে বলেন, ‘ওদের’ (প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায় তিনি সেই ‘সন্ত্রাসীদের’ বোঝাচ্ছেন) ‘রাতে মনে হয়…আরও অনেক কিছু পরিকল্পনা আছে’। এরপর তিনি জানতে চান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি সেনাবাহিনী নামানোর মতো ‘সর্বোচ্চ পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথা বলেছেন কি না। শেখ হাসিনা বলেন, সেনাবাহিনী নামানোর প্রয়োজন নেই। তবে তিনি জানান, তিনি সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সেনাবাহিনী ‘রেডি’ আছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন দিয়ে আকাশ থেকে ছবি তোলা এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার।
বার্গম্যান লেখেন, এরপর শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ‘সবগুলিকে অ্যারেস্ট করতে নির্দেশ’ দিয়েছেন। তিনি জানান, একাধিক সংস্থাকে বলা হয়েছে—‘যে যেখান থেকে যে কয়টা পারবা ধইরা ফেলো।’ এরপর তাপস বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের জানিয়েছেন যে ‘ওরা’ এখন মোহাম্মদপুর থানার দিকে এগোচ্ছে।
বার্গম্যান আরো বলেন, ফোনালাপটির এই ব্যাখ্যা মেনে নিলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন যে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং মাঠপর্যায়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো শেখ হাসিনার নির্দেশের প্রকৃত ব্যাপ্তি ও প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাপসের সঙ্গে এই ফোনালাপটি বিবেচনায় নিলে শেখ হাসিনা ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি স্পষ্ট হয় না।
তিনি বলেন, কিন্তু ফোনালাপের বাইরে যেসব প্রমাণ আছে, সেগুলো শক্তভাবে বোঝায় যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের মধ্যেই ছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ভুল সংশোধন করতে বা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে সংযত রাখতে শেখ হাসিনা পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়টির একটি লিংক নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আজ বিকেলে শেয়ার করে ডেভিড বার্গম্যান লেখেন, ‘আল জাজিরার সাথে সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার মা শেখ হাসিনার জব্দ হওয়া একটি ফোনের কথা সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট ছাড়া দেখানো হয়েছে। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা জুলাই ২০২৪-এ সাধারণ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন তা এই কথোপকথন থেকে প্রমাণিত হয় না। সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে জয়ের এই দাবির কোন সত্যতা কি পাওয়া যায়?’
ডেভিড বার্গম্যানের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি কর্তৃপক্ষের ভেরিফায়েড নয়। তবে সুখবর ডটকম নিশ্চিত হয়েছে অ্যাকাউন্টটি তিনিই পরিচালনা করেন। তিনি অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখে আসছেন।
খবরটি শেয়ার করুন