ছবি: সংগৃহীত
দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে—গত দেড় বছরে এমন ধারণা রাজনীতির অন্দরে-বাইরে বেশ জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন মনে করেন, রাজনীতিতে কোনো দলকে একেবারে ‘আউট’ ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
তার ভাষায়, মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতি খুব দীর্ঘ নয়, ফলে আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে এবং ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচনে অংশও নিতে পারে। আজ সোমবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন এই মন্তব্য করেন।
তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এবং দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলছে।
সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমি মনে করি আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে একেবারে আউট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে, এমন হবে না। আমাদের মানুষজনের স্মৃতিশক্তি খুব দীর্ঘ না। তারা আবার রাজনীতিতে ফিরে আসবে এবং নির্বাচনে অংশ নেবে।”
তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ, গত কয়েক বছরে দেশের রাজনীতিতে যে বড় পরিবর্তন ঘটেছে, তার কেন্দ্রেই ছিল আওয়ামী লীগের অবস্থান। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকারের সময় ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সংসদে এই সিদ্ধান্ত আইনি ভিত্তি পায়। সংসদে পাস হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল–২০২৬ অনুযায়ী আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।
আইনটির মাধ্যমে শুধু দলীয় কার্যক্রম নয়, জনসভা, মিছিল, বিবৃতি, প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কার্যক্রমের ওপরও নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতার দিকে। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা এবং দলটির সামাজিক বা রাজনৈতিক সমর্থন পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়া—দুই বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন অনেকে।
সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন আরও বলেন, দায়িত্বে থাকলে তিনি শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর জন্য ভারতকে চিঠি লিখতেন, যদিও তার ধারণা ছিল সেটি কার্যকর হতো না।
তিনি বলেন, “জানতাম এ চিঠি কাজ নাও করতে পারে, তারপরও দায়িত্বের জায়গা থেকে সেটি করতাম।” সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি ভারতীয় একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি “মাথা উঁচু করে” দেশে ফিরতে চান। তার দাবি, রাজনৈতিকভাবে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং দেশের জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার রয়েছে। এই বক্তব্যও সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তৌহিদ হোসেন তার সাক্ষাৎকারে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, সাত সদস্যের একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিত এবং প্রতি মঙ্গলবার তাদের বৈঠক হতো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পরে জানতে পারেন নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
তিনি বলেন, “সিদ্ধান্ত নেয় কেউ কেউ—এ ধরনের কথা শুনতাম। কিন্তু পরে জানতে পারি নিয়মিত একটা গ্রুপ বসত।” সরকার পরিচালনায় নিজের অসন্তুষ্টির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, নিজ মন্ত্রণালয়েই একাধিক উপদেষ্টার প্রভাব ছিল এবং এ কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তৌহিদ হোসেন বলেন, “উপদেষ্টাদের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ছিল না, কিন্তু তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হতো। কারণ উচ্চপর্যায়ে তাদের মতামত গুরুত্ব পেত।” জুলাই আন্দোলনের সময় ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বড় ঘটনায় এমন শক্তির উপস্থিতি দেখা যায়। তার ভাষায়, “ডিপ স্টেট স্রোতের বিপক্ষে যায় না, বরং স্রোতের সঙ্গে থেকে সেটিকে ম্যানিপুলেট করে।”
এদিকে ভোটের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, ওই প্রক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি বলেন, “এতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যুক্ত ছিলেন। কোনো বাধ্যবাধকতা থাকলে বিষয়টি ভিন্ন। অন্যথায় নির্বাচিত সরকারের জন্য সিদ্ধান্ত রেখে দেওয়াই ভালো হতো।”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারের মূল্যায়নে এখনই যেতে চান না বলেও জানান তিনি। তবে তার মতে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আন্তর্জাতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা তার সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—দুর্বল বা কোণঠাসা অবস্থান থেকে দলগুলো আবারও ফিরে এসেছে। একসময় নিষিদ্ধ হওয়া বা দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক সংকটে থাকা দলও পরবর্তীকালে জনসমর্থন পুনর্গঠন করতে পেরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলেও তাদের সামাজিক ভিত্তি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তৌহিদ হোসেনের মন্তব্য সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—আওয়ামী লীগ কি রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে বিদায় নিয়েছে, নাকি এটি শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি অন্তর্বিরতি? উত্তরটি হয়তো এখনই স্পষ্ট নয়, তবে রাজনীতিতে বিতর্কটি আবার নতুন করে শুরু হলো।
খবরটি শেয়ার করুন