রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক: উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১২ জন ৩ দিনের রিমান্ডে

বাড়তি খরচে বিপর্যস্ত নিম্নআয়ের মানুষের সংসার

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৪:৩৭ অপরাহ্ন, ২১শে এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁও। বৈশাখের তপ্ত দুপুর। গরমে ক্লান্ত, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে শাহনাজ আক্তারের। একটি সবজির দোকানে দাঁড়িয়ে বেগুনের দরদাম করছেন তিনি। পরনের শাড়িটি মলিন, চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কয়েক সপ্তাহ আগেও ৪০০ টাকায় তার ছয় সদস্যের পরিবারের দৈনন্দিন বাজার হয়ে যেত। এখন সেই টাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অর্ধেকও মেলে না। মৃদুস্বরে তিনি বলেন, “তেল ছাড়া তো রান্না করা যায় না। কিন্তু আজও তেল না নিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে।”

শাহনাজের স্বামী একজন অটোরিকশাচালক। আগে সংসার চালাতে ধার করতে হতো না। এখন প্রায়ই স্থানীয় দোকান থেকে বাকিতে কিনতে হচ্ছে, না হলে প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনেই ফিরে আসতে হচ্ছে। নিজের আয় বাড়াতে শাহনাজ গৃহকর্মীর কাজ খুঁজছেন, কিন্তু এখনো কোনো কাজ পাননি। তিনি বলেন, “কাজ না পেলে বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।” শাহনাজের গল্প একা নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিলে এমন অসংখ্য পরিবারের দেখা মেলে, যারা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে।

মিরপুরের বাসিন্দা রিকশাচালক সাইফুল ইসলামও একই সংকটে। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার চারজনের সংসার। আগে সপ্তাহে একদিন মাংস খাওয়ার চেষ্টা করতেন। এখন মাসে একবারও তা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, “আগে ১ হাজার টাকায় বাজার করে তিন-চার দিন চলত। এখন দুই দিনও চলে না। ভাত-ডালেই বেশি দিন কাটাতে হচ্ছে।” গত তিন বছরে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। এক সংকট কাটার আগেই আরেকটি এসে হাজির হচ্ছে। মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। অর্থাৎ কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ঢাকার একটি প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানে কাজ করা রেজানুর রহমান রিফাত এই বাস্তবতার মুখোমুখি। এক সন্তানের জনক রিফাত বলেন, “হঠাৎ করে জ্বালানির খরচ ২০ শতাংশ বেড়ে গেল। কিন্তু বেতন তো বাড়বে না। কোথাও না কোথাও খরচ কমাতেই হবে।”

তার স্ত্রী চাকরি করলেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃদ্ধ মা-বাবাকেও দেখাশোনা করতে হয়। আগে প্রতি মাসে কিছু টাকা সঞ্চয় করতেন, এখন সেটিও কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “আগে ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত ছিলাম। এখন মনে হয়, যেকোনো সময় বড় বিপদে পড়তে পারি।” গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে বেড়েছে এলপিজি গ্যাসের দাম। এর প্রভাব দ্রুতই বাজারে পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে।

কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মোশাররফ হোসেন বলেন, “গত এক সপ্তাহেই কেজিতে ১৫-২০ টাকা করে দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচই বেশি।” সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্যেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫২.৫ টাকা থেকে বেড়ে ৫৭.৫ টাকা হয়েছে। কাঁচামরিচের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। আদা, দারুচিনি, রসুন—সব কিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী।

কল্যাণপুর এলাকায় ফল বিক্রেতা কামাল হোসেন জানান, তার সন্তানরা মুরগির মাংস খেতে চাইলেও এখন তা নিয়মিত কেনা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, “আগে পাঙাশ মাছ এড়িয়ে চলতাম। এখন সেটাই কিনতে হচ্ছে। ভালো খাবার খাওয়া এখন বিলাসিতা।” একই চিত্র ইব্রাহিমপুরের ছোট ভাতের হোটেল মালিক সাজেদুর রহমানের জীবনেও। তিনি বলেন, “এক সপ্তাহে সবজি কেনার খরচ ৭০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় উঠেছে। তেলের দামও বেড়েছে। এখন যদি খাবারের দাম বাড়াই, ক্রেতা কমে যেতে পারে।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু পরিবহন নয়, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও আমদানির ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। এই পরিস্থিতিতে নিম্নআয়ের মানুষ প্রথমে খাদ্যবহির্ভূত খরচ কমিয়ে দেয়। এরপরও সামাল না দিতে পারলে খাবারের পরিমাণ কমায়। সবশেষে তারা পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে কমদামি খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

গাজীপুরের একটি কারখানার শ্রমিক নাসিমা বেগম বলেন, “আগে বাচ্চাদের দুধ কিনতাম। এখন সেটা বন্ধ। ডিমও কম খাই। কী করব, টাকাই তো নেই।” বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম আরও বাড়ছে। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পশ্চিম আগারগাঁওয়ের শাহনাজ আক্তার এখনও কাজের খোঁজে ঘুরছেন। তিন মাস আগেও যেভাবে সংসার চালাতে পারতেন, এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। সামনে কী হবে, সে বিষয়ে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার কথায়, “আগে কষ্ট ছিল, কিন্তু চলত। এখন মনে হয়, দিন দিন সবকিছু হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।” শাহনাজ, সাইফুল, রিফাত কিংবা নাসিমাদের জীবনের এই টানাপড়েনই বলে দেয়—সংখ্যার হিসাবের বাইরে মূল্যস্ফীতির আসল চিত্র কতটা নির্মম।

নিম্নআয়ের মানুষের সংসার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250