ছবি: সংগৃহীত
দেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে নানা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কা সামলে প্রবৃদ্ধির ধারায় এগিয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের বিস্তার, রেমিট্যান্স প্রবাহ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে প্রায়ই ‘উন্নয়নের বিস্ময়’ বলা হয়েছে। কিন্তু এখন সেই পরিচিত অর্থনৈতিক গল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) যৌথভাবে গতকাল সোমবার (১৮ মে) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন একটি চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেশের অর্থনীতিকে গত কয়েক দশকের অন্যতম কঠিন সময়ের মুখোমুখি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সোমবার রাজধানী ঢাকায় পিআরআইয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: স্পেশাল ফোকাস—আ বিজনেস এনভায়রনমেন্ট দ্যাট ডেলিভার্স জবস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক ও পিআরআই। সেখানে অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকেরা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একক কোনো সংকটে নেই; বরং একই সময়ে একাধিক কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কমতে থাকা বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির শ্লথতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে যেতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে টানা তৃতীয় বছরের মতো প্রবৃদ্ধির গতি কমবে। দেশের অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ৬ থেকে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছিল। সেই জায়গা থেকে ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসার আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের কাছে একটি বড় সতর্ক সংকেত।
তবে সংখ্যার চেয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে বেসরকারি বিনিয়োগের অবস্থা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর গত ৩৫ বছরের মধ্যে এবার প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায় গেছে। সাধারণত বিনিয়োগের প্রবাহ কমে গেলে তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শুধু শিল্পে পড়ে না; কয়েক বছর পর সেটি কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির ওপরও প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগকারীরা যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তখন নতুন শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণে আগ্রহ কমে যায়।
অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে এবং বৈদেশিক খাতের চাপ পুরোপুরি কাটবে না। শক্তিশালী রেমিট্যান্স কিছুটা সহায়তা করলেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা উদ্বেগ তৈরি করছে। তার মতে, দ্রুত বাড়তে থাকা শ্রমশক্তিকে অর্থনীতিতে যুক্ত করতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ধ্রুব শর্মা আরও সতর্ক করেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতিতে। অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থায় এমন বাহ্যিক ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার দেশের গত তিন দশকের প্রবৃদ্ধি মডেলের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির ফলে দারিদ্র্য কমেছে, কিন্তু সেই মডেল এখন চাপের মুখে। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিশেষ করে যুব বেকারত্ব প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। প্রবৃদ্ধি বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য কমানোর গতিও থেমে যেতে পারে।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অধিকাংশ চাকরি এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে মজুরি কম এবং চাকরির নিরাপত্তাও সীমিত। তাঁর মতে, সস্তা শ্রমনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেল থেকে বের হয়ে বহুমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে যেতে হবে।
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ টি আই এম নুরুল কবির মনে করেন, রাজস্বনীতির ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা চান। নীতি যদি ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়, তাহলে নতুন বিনিয়োগে অনীহা বাড়ে।
পিআরআইয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমানের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থা ও আর্থিক খাত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে।
মূলধারার অর্থনৈতিক আলোচনাতেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। একটি সমস্যা অন্যটিকে আরও জটিল করছে। উদাহরণ হিসেবে ব্যাংক খাত দুর্বল হলে শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়; ঋণপ্রবাহ কমলে বিনিয়োগ কমে; বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে প্রতিবেদনে শুধু সংকটের চিত্র নয়, উত্তরণের পথও দেখানো হয়েছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, করব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে বাধা দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা পরিবেশ গড়ে তোলাও জরুরি।
দেশের অর্থনীতি অতীতেও নানা সংকট অতিক্রম করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, এবার চ্যালেঞ্জগুলো একই সঙ্গে বহু দিক থেকে এসেছে। তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, এখন প্রশ্ন উঠছে প্রবৃদ্ধির গুণগত মান, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও। বিশ্বব্যাংক ও পিআরআইয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই প্রশ্নগুলোকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন