ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকায় শেখ হাসিনাকে 'দক্ষিণ এশিয়ার লৌহমানবী' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, এই মুহূর্তে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর হয়ে তিনি প্রকৃতপক্ষেই হয়ে উঠতে পারেন সেই লৌহমানবী, যাকে আমাদের প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর উইনস্টন চার্চিলের লেখা ছয় খণ্ডের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডটির শিরোনাম ধার করে পদ্মা সেতুর সমাপ্তিকে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বের সবচেয়ে 'সেরা সময়' হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান মাহফুজ আনাম।
তিনি বলেন, করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে শেখ হাসিনার অসাধারণ নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পেয়েছে, এতটা আগে প্রকাশ পায়নি। বিশ্বব্যাংককে উপেক্ষা করার প্রতীকী গুরুত্ব দেখানো, দেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব বুঝতে পারা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে উত্থান-পতনের মধ্যে প্রকল্পটি চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসে অবিচল থাকার মতো পারদর্শিতা শেখ হাসিনার রয়েছে।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করার বিষয়ে শেখ হাসিনার এই অন্তর্জ্ঞান জাতির জন্য বিশাল গৌরব হিসেবে 'আমরা পারি' উপলব্ধি জাগিয়ে তুলবে। একজন আধুনিক ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে এটা ছিল তার সবচেয়ে দক্ষ কাজ। বস্তুত আমরা আবারও বলতে চাই, এটা তার 'সেরা সময়'।
মাহফুজ আনাম বলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জন্য গর্বের একটি প্রতীক। এটি আমাদের গর্ব ও আত্মবিশ্বাসের, অভীষ্ট ও সংকল্পের, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের, কল্পনা এবং তা বাস্তবে রূপান্তরের প্রতীক। পদ্মা সেতুর সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটি জাতি হিসেবে এবং বাংলাদেশ একটি দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে ঘোষণা করছে যে, এটা আকস্মিক ঘটে যাওয়া কিছু ইতিবাচক ঘটনার সংমিশ্রণ নয় বরং আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ। যা একটি দেশকে অনুন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারে প্রকাশিত দুটি উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার পুরনো দুটি লেখার লিংক সম্প্রতি ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তার লেখা দুটির মধ্যে একটি ২০২৪ সালের ১৯শে জানুয়ারি 'হোয়ার দ্য পিএম শোড রিয়েলি বি অ্যান আইরন লেডি' এবং অন্যটি ২০২২ সালের ২৫শে জুন 'শেখ হাসিনাস ফাইনেস্ট আওয়ার' শিরোনামে ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়।
দুটি লেখার লিংক ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইট সংস্করণ থেকে সম্প্রতি মুছে ফেলা হয়েছে। তবে মাহফুজ আনামের লেখা উপসম্পাদকীয় দুটি প্রকাশিত হওয়ার দিনই বাংলায় সেগুলোর অনুবাদ করে ডেইলি স্টারের বাংলা ডিজিটাল সংস্করণে প্রকাশিত হয়। বাংলা লেখা দুটির লিংক ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইটে এখনো রয়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে মাহফুজ আনামের কলামের বাংলায় অনুবাদ হওয়ার লিংকগুলোই ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত, পরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ এবং দলটির নেতৃত্বাধীন সরকারের সম্পর্কে আগে লেখা বা বলা ইতিবাচক মূল্যায়ন সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল, বা দলটির কর্মী-সমর্থকেরা এসব লেখা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
গণ-অভ্যুত্থান দমনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গণহত্যা ও আওয়ামী লীগের শাসনের সময়ে গুমের অভিযোগগুলোর বিচারের উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।
২০২৪ সালের ১৯শে জানুয়ারি প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম লেখেন, টানা চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেই গত ১৫ই জানুয়ারি মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী (সাবেক) শেখ হাসিনা বলেছেন, 'আমি কোনো ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম সহ্য করব না।' তিনি বলেছেন, 'স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি' নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করে স্বচ্ছ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি আমাদের কানে যেন ভাঙা ক্যাসেটের মতো বাজে। কারণ, কথাগুলো এতো বেশি বলা হয়েছে যে এর বিশ্বাসযোগ্যতাই হারিয়ে গেছে। তারপরও আমরা এগুলো শুনতে চাই। কারণ, অন্তহীন বিশ্বাস এবং অনেকের মতে নির্বোধের মতো প্রত্যাশা নিয়ে আমরা অপেক্ষায় থাকি যে এবার বুঝি সত্যি সত্যিই কথাগুলো বাস্তবে রূপ নেবে।
তিনি বলেন, দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকায় (১৩ থেকে ১৯ জানুয়ারির সংস্করণ, ২০২৪) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'দক্ষিণ এশিয়ার লৌহমানবী' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর পেছনে সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে গত ১৫ বছরে তার দেশ পরিচালনার প্রক্রিয়া, জাতীয় নির্বাচনে নিজের ও দলের জন্য পঞ্চম মেয়াদে বিজয় নিশ্চিত করা এবং তার সমালোচক, বিরোধী দল বিএনপি ও সার্বিকভাবে সব বিরুদ্ধমতের দমন।
তিনি বলেন, মোটা দাগে বলতে গেলে মানুষ দুইভাবে দুর্নীতি করে। একটি অংশ কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি করে। আরেকটি অংশ প্রয়োজনে আইন নিজেদের মতো পরিবর্তন করে দুর্নীতি করে। আজকের দিনে বাংলাদেশে দ্বিতীয় অংশটি অনেক বড় ব্যবধানে প্রথম অংশের চেয়ে এগিয়ে আছে।
তিনি লেখেন, নির্মম ও দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দ্বিতীয় অংশটির বেশিরভাগ সদস্য (সাবেক) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশেপাশেই থাকেন এবং তাদের অনেকে আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদাও পেয়েছেন—যারা আমাদের অর্থনীতি ও দেশকে বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। আমরা যদি সবচেয়ে বড় ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী, কানাডা ও মালয়েশিয়ার 'বেগমপাড়ার' বাসিন্দাদের কথা ধরি, তাহলে দেখতে পাবো যে তাদের অনেকেই ক্ষমতার কেন্দ্রের চারপাশেই রয়েছেন।
২০২২ সালের ২৫শে জুনের কলামে মাহফুজ আনাম বলেন, একটি জাতির জীবনে নানা ধরনের ঘটনা ও প্রতীক থাকে। যদিও বেশিরভাগ সময়ই ঘটনাগুলো প্রাধান্য পায়, প্রতীকগুলো কখনো কখনো জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তাৎপর্য তৈরি করে। এই ধরনের প্রতীকগুলো আমাদের আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করে এবং বিশ্বের কাছে প্রমাণ করে যে, আমরা নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে, কঠিন বাধা অতিক্রম করতে এবং সবার জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সম্মিলিত মানবিক প্রচেষ্টায় সক্রিয় অংশীজন হতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু যেন সত্যিকার অর্থে জাতির দক্ষতা ও উন্নয়নের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেতুটি যেন শুধু পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিষ্ঠান, আইন ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও সামগ্রিকভাবে আধুনিকতায় রূপান্তরের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্ববাসী দেখুক বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন, স্বাধীনতা, অধিকার ও গণতন্ত্রের দেশে পরিণত হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন