ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার দাবি, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১১ দলীয় জোটকে পরাজিত করা হয়েছে এবং সেই ষড়যন্ত্রে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ পরিচয়ের ব্যক্তিরাও জড়িত ছিলেন। তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাম্প্রতিক ইতিহাস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত জনমতের মধ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা যাচ্ছে।
বুধবার (৮ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলের আইডিইবি ভবনে আয়োজিত 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আমাদের বাস্তবতা' শিরোনামে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
শফিকুর রহমান বলেন, তারা নির্বাচন চেয়েছিলেন, কিন্তু নির্বাচনের নামে ষড়যন্ত্র চাননি। তার ভাষ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ পরিচয়ের ব্যক্তিদের একটি অংশও সেই ষড়যন্ত্রে শরিক ছিলেন এবং পরে নিজেরাই তা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি কারা এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বা কবে, কোথায় এমন বক্তব্য এসেছে—তা স্পষ্ট করেননি।
তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ১১ দলীয় জোট নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। তার মতে, ফল প্রত্যাখ্যান করলে দেশে গৃহযুদ্ধ বা ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হতে পারত। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহতদের রক্ত শুকানোর আগেই কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনমুখী রাজনীতি শুরু করেছিল।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই অভিযোগের সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। একই সময়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার পর দলটি আবারও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন ফিরে পায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এর ফলে দীর্ঘ সময় পর দলটি নিজেদের প্রতীক নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে জামায়াত সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক ও আইনি সংকটে ছিল। ২০১৩ সালে আদালতের রায়ের পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে। পরবর্তী সময়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার সম্পন্ন হয়। সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। দলের সাবেক আমির গোলাম আযম মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত অবস্থায় মারা যান। আরেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কারাবন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এসব ঘটনার ফলে দলটির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়ে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যায়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিবন্ধন পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পাওয়ার ফলে দলটি নতুন করে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া দলগুলোর একটি ছিল জামায়াত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। সেই নির্বাচনে জামায়াত প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বেশি আসন অর্জন করে। দলটির সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনী বাস্তবতা জামায়াতের জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শফিকুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ফেসবুক, এক্সসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী লিখছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ছিল জামায়াত। তাদের ভাষ্য, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম রাজনৈতিক 'বেনিফিশিয়ারি' দলটি এখন সেই সময়ের সরকারের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব মন্তব্য জনমতের একটি অংশকে প্রতিফলিত করে; এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা দাবি নয়।
এদিকে বিএনপির একাধিক নেতা অতীতেও অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অংশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আরও পিছিয়ে দিতে আগ্রহী ছিল এবং সেই অবস্থানের সঙ্গে জামায়াতের মিল ছিল। বিএনপির দাবি, নির্বাচন বিলম্বিত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। তবে জামায়াত বরাবরই এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোনো নির্বাচনে অনিয়ম বা প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে এমন অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনীতিতে পরাজয়ের পর প্রায় সব দলই কোনো না কোনো সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, যে সরকার বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাধ্যমে একটি দল উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক ও নির্বাচনী সুবিধা পেয়েছে, সেই সরকারকেই পরে ষড়যন্ত্রের জন্য দায়ী করলে তা স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সব মিলিয়ে শফিকুর রহমানের বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিলেও তার উত্থাপিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মূল্যায়ন ইঙ্গিত করে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া দলগুলোর তালিকায় জামায়াতের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে। তাই ষড়যন্ত্রের অভিযোগের পাশাপাশি এই রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন