ছবি: পিটিআই
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। বরং তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেছেন, “প্রত্যর্পণের বিষয়টি একটি আইনি বিষয়, এবং সেটি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হবে।” একই সঙ্গে তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের অবস্থানে “কোনো পরিবর্তন হয়নি”।
এই বক্তব্যটি কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, কয়েক দিন আগেই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও তিনি নিজের জন্মভূমিতেই ফিরতে চান।
এই ঘোষণার পর মঙ্গলবার নয়াদিল্লির সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিক জানতে চান, শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না। কিন্তু জয়সোয়াল সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান। তিনি শুধু প্রত্যর্পণকে একটি আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আগের অবস্থান বহাল থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই ভাষা মোটেই আকস্মিক নয়। বরং এটি কয়েক মাস ধরে অনুসৃত একই নীতির ধারাবাহিকতা। গত এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করার পরও ভারত বলেছিল, বিষয়টি বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
ফলে এবারও নয়াদিল্লি রাজনৈতিক মন্তব্য থেকে সচেতনভাবে দূরে থেকেছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি একটি পরিচিত কৌশল। কোনো সংবেদনশীল বিষয়ে সরকার যদি প্রকাশ্যে অবস্থান না বদলাতে চায়, তবে সাধারণত তারা বিষয়টিকে ‘আইনি প্রক্রিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে। এতে একদিকে ভবিষ্যতের জন্য কূটনৈতিক নমনীয়তা বজায় থাকে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষকে আগাম রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়া হয় না।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত কয়েক মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারত প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে না; বরং বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জয়সোয়ালের বক্তব্যে অন্তত তিনটি কূটনৈতিক ইঙ্গিত রয়েছে। প্রথমত, ভারত শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ঘোষণাকে সরকারি অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করতে চায় না। তিনি দেশে ফিরতে চান কি না, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে; কিন্তু ভারতের কাছে মূল বিষয় হলো বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ এবং সেটি আইনগতভাবে কীভাবে বিবেচিত হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারত প্রকাশ্যে এমন কোনো মন্তব্য করতে চায় না, যাতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। শেখ হাসিনা বর্তমানে বাংলাদেশের বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তাকে ঘিরে যেকোনো মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, নয়াদিল্লি একই সঙ্গে ঢাকা ও আন্তর্জাতিক মহলকে জানাতে চাইছে যে, তারা কোনো একতরফা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। বরং বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই বিষয়টি বিবেচিত হবে।
দিল্লিভিত্তিক কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও প্রত্যেকটি অনুরোধ আলাদাভাবে আইনগতভাবে পরীক্ষা করা হয়। কোনো দেশের আদালতের রায়, মানবাধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনি অধিকার এবং দুই দেশের চুক্তির বিধান—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাই শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রত্যর্পণ সম্পন্ন হয় না।
এদিকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তার দেশে ফেরার পরিকল্পনা ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে নয়। তিনি বলেছেন, এটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদেরও আদালতে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ সরকার অবশ্য শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই তাদের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ চেয়েছে এবং শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বক্তব্যকে অনেকেই একটি ‘কন্টিনিউটি স্টেটমেন্ট’ বা ধারাবাহিক অবস্থানের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন। কারণ, জয়সোয়াল নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি, আবার প্রত্যর্পণের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। তিনি শুধু বলেছেন, আগের অবস্থানই বহাল রয়েছে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক মাসে দুই দেশ সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিতর্কে যেতে চায় না ভারত।
সেই কারণেই একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে ভারতীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠলে জয়সোয়াল বলেন, এসব প্রকল্প পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। অর্থাৎ, শেখ হাসিনার ইস্যু এবং দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগিতাকে ভারত আলাদা দুটি বিষয়ে পরিণত করতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক ভাষায় অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা থাকে ‘যা বলা হয়নি’-এর মধ্যেই। জয়সোয়াল শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা সমর্থনও করেননি, বিরোধিতাও করেননি। তিনি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কথাও বলেননি। আবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে—এ কথাও বলেননি।
এই নীরবতাই মূলত ভারতের বর্তমান কৌশলের প্রতিফলন। নয়াদিল্লি আপাতত প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার বদলে আইনি প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে সময় নিতে চায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা এবং শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য কূটনৈতিক বিকল্পগুলোও খোলা রাখতে চাইছে।
ফলে জয়সোয়ালের ১৪ জুলাইয়ের বক্তব্যকে কেবল একটি নিয়মিত ব্রিফিংয়ের মন্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি এমন এক পরিমিত কূটনৈতিক ভাষা, যেখানে প্রত্যর্পণের দরজা বন্ধও করা হয়নি, আবার শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনো রাজনৈতিক আশ্বাসও দেওয়া হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের জন্য সম্ভবত এটিই সবচেয়ে সতর্ক এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান।
খবরটি শেয়ার করুন