মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

সেনা হস্তক্ষেপ, বিদেশি চাপ ও নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির বিতর্কিত অধ্যায়

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০১:৩৬ অপরাহ্ন, ৯ই মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী আজ ৯ মে প্রকাশিত তার “ওয়ান ইলেভেনের ময়নাতদন্ত: জাতিসংঘের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এবং মইনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশ” শীর্ষক লেখায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় ওয়ান-ইলেভেনকে নতুন করে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।

তার উপস্থাপনায় উঠে এসেছে সেনাসমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পটভূমি, বিদেশি কূটনৈতিক তৎপরতা, গোয়েন্দা সংস্থার কথিত ভূমিকা, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নানা বিতর্ক।

লেখাটির মূল সুর হচ্ছে—ওয়ান-ইলেভেন ছিল কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের ফল নয়; বরং দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক উচ্চাভিলাষ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা-রাজনীতির সমন্বয়ে তৈরি এক জটিল বাস্তবতা।

লেখক একাধিক সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তনের পেছনে অন্তত আটজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মতিউর রহমান চৌধুরী ২০০৪ সালের পরবর্তী সময়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখিয়েছেন। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে, সে সময় বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা, জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের উত্থান এবং ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে “উগ্রবাদের ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে পশ্চিমা বিশ্ব ও প্রতিবেশী দেশের মধ্যে তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংঘাতকে তিনি ওয়ান-ইলেভেনের প্রত্যক্ষ পূর্বভূমি হিসেবে দেখিয়েছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়ে বিরোধ, বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার সিদ্ধান্ত এবং রাজপথে সহিংস আন্দোলন পরিস্থিতিকে চরমে নিয়ে যায়। মতিউর রহমান চৌধুরীর মতে, এই সংকটকে আরও উসকে দেয় বিদেশি কূটনৈতিক মহল ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা।

লেখায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিস, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের ভূমিকা। মতিউর রহমান চৌধুরীর দাবি, তারা “মাইনাস টু” ফর্মুলা—অর্থাৎ শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—উভয়কে রাজনীতির বাইরে সরানোর ধারণা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেছিলেন।

যদিও এ ধরনের অভিযোগ অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে এসেছে, তবে সংশ্লিষ্ট বিদেশি পক্ষগুলো প্রকাশ্যে কখনো এমন উদ্যোগের কথা স্বীকার করেনি।

লেখাটির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ভূমিকা ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের বিবরণ। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন ও ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারীকে “চার কুশীলব” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মতিউর রহমান চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করেন। এমনকি বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে কার্যত সরে দাঁড়াতে বাধ্য করার ঘটনাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখায় আরও দাবি করা হয়েছে, সেনা-সমর্থিত সরকারের সূচনার আগে ও পরে শেখ হাসিনার সঙ্গে কয়েকজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার একাধিক বৈঠক হয়েছিল।

লেখক ইঙ্গিত দিয়েছেন, ওয়ান-ইলেভেনের প্রাথমিক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সেনা নেতৃত্বের একটি বোঝাপড়া ছিল। তবে পরবর্তীতে শেখ হাসিনাকেও গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়। একইভাবে গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

লেখাটিতে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে। মতিউর রহমান চৌধুরীর মতে, সে সময় কিছু গণমাধ্যম ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সেনাসমর্থিত সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিলেন। রাজনীতিবিদদের “চরিত্রহনন” এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে “ট্রুথ কমিশন” গঠনের বিষয়টিকে তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে দেখিয়েছেন। তার দাবি, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের আড়ালে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি প্রচেষ্টা চলছিল।

২০০৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে মতিউর রহমান চৌধুরী আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, নির্বাচনের আগে বিপুল পরিমাণ ব্যালট ছাপানো হয়েছিল এবং নির্বাচনী প্রকৌশলে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কিছু অংশ জড়িত ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে এ ধরনের অভিযোগ বরাবরই বিতর্কিত এবং নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশ সে সময়ের নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বলেই মূল্যায়ন করেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ওয়ান-ইলেভেন দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় একটি গভীর প্রভাব ফেলা ঘটনা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, সে সময়কার রাজনৈতিক সংঘাত, অবিশ্বাস ও সহিংসতা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যেখানে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপকে অনেক নাগরিক প্রথমদিকে “স্বস্তির” চোখে দেখেছিলেন।

কিন্তু পরবর্তীতে দীর্ঘায়িত জরুরি অবস্থা, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্যহীনতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে।

সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা প্রায়ই বলে থাকেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর “স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার” নীতি অনেক সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখায় সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যায়।

তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো নিজেদের ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিল।

লেখাটিতে জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়ক রেনাটা লকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন বার্তা সেনাবাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করেছিল। যদিও এই অবস্থান জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক নীতির অংশ ছিল কি না, তা নিয়ে লেখক নিজেও প্রশ্ন তুলেছেন।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মতিউর রহমান চৌধুরীর এই লেখার তাৎপর্য শুধু অতীত পুনরালোচনায় নয়; বরং দেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি, সেনাবাহিনী, বিদেশি কূটনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আনার মধ্যেও নিহিত।

তার উপস্থাপনায় ওয়ান-ইলেভেনকে কেবল একটি “সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার” হিসেবে নয়, বরং বহুস্তরীয় ক্ষমতার সংঘর্ষের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে তার লেখার বহু দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি এবং এর কিছু অংশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, জিজ্ঞাসাবাদ বা অনানুষ্ঠানিক সূত্রনির্ভর। ফলে পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

তবু প্রায় দুই দশক পরও ওয়ান-ইলেভেন যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ও অসমাপ্ত অধ্যায়—মতিউর রহমান চৌধুরীর এই দীর্ঘ অনুসন্ধানধর্মী লেখাটি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

মতিউর রহমান চৌধুরী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250