ছবি: সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে জাতীয় পতাকা বিকৃত করে আরবি অক্ষরে কালেমা যুক্ত করে বিক্রির অভিযোগে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাদা ও কালো রঙের কালেমা-খচিত পতাকা উড়তে দেখা যাওয়ায় নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে এর পেছনে কোনো সংগঠিত উদ্দেশ্য বা মতাদর্শিক প্রচারণা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পুলিশ সুখবর ডটকমকে জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালিয়ে দুইজনকে আটক করা হয়। পরে গতকাল শুক্রবার দুপুরে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সুখবর ডটকমকে মুঠোফোনে নিশ্চিত করেছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এমদাদুল হক।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার মাওলানা এরশাদ আলীর ছেলে মো. নিয়ামক উল্লাহ (২৫) এবং শেরপুর সদর উপজেলার চান মিয়ার ছেলে সিদ্দিক (২৬)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ২ নম্বর ওয়ার্ডের মিতালি মার্কেট এলাকায় তারা জাতীয় পতাকার নকশা পরিবর্তন করে আরবি অক্ষরে কালেমা লেখা পতাকা তৈরি করতেন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করতেন। সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তাদের তৈরি এ ধরনের পতাকা উড়তে দেখা গেলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। এরপর তাদের সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়।
ওসি মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, জাতীয় পতাকাকে বিকৃত করে কালেমা সংযুক্ত পতাকা তৈরি করে অনলাইন পেজের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছিল। এ কার্যক্রমের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিদেশি পতাকা ওড়ানোর সংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন নয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ফ্রান্সের সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের প্রিয় দলের পতাকা ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাদা ও কালো রঙের ‘কালেমার পতাকা’ নামে পরিচিত পতাকা উড়তে শুরু করায় নতুন আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব পতাকার নকশা ও ব্যবহার কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ নয়; বরং এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক অবস্থানও প্রচারের চেষ্টা থাকতে পারে। তাদের ভাষ্য, এসব পতাকায় ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার আহ্বানের চেয়ে পতাকাবাহীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার বার্তাই বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে দুটি ধরনের কালেমা-খচিত পতাকা বেশি দেখা যাচ্ছে। একটি সাদা পটভূমিতে কালো আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা এবং অন্যটি কালো পটভূমিতে সাদা আরবি অক্ষরে একই কালেমা লেখা। তাদের মতে, এই দুটি নকশা যথাক্রমে আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন এবং আল-কায়েদাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের ব্যবহৃত প্রতীকের সঙ্গে মিল রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, কালো পটভূমিতে সাদা হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা পতাকা আল-কায়েদার বিভিন্ন শাখাও ব্যবহার করে। অন্যদিকে তালেবানের পতাকায় যে ধরনের আরবি ক্যালিগ্রাফি ব্যবহৃত হয়েছে, বাংলাদেশে উড়তে দেখা অনেক পতাকায়ও একই ধরনের ক্যালিগ্রাফি ও নকশা অনুসরণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে এই দুই ধরনের পতাকা ব্যবহার করে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংগঠনটি ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচি পালনকালে একই ধরনের সাদা ও কালো পতাকা ব্যবহার করেছিল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এসব পতাকার প্রকাশ্য ব্যবহারকে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের মতে, সীমান্তে পুশইন, ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশে হামাসের তৎপরতা বাড়ছে—এমন মন্তব্য, ইউনূস সরকারের আমলে তালেবান সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তা মোল্লা নূর আহমদ নূর ওরফে মোল্লা জাওয়ান্দির নীরবে ঢাকা সফর এবং আফগান জঙ্গি নিয়ামাতুল্লাহ মাঙ্গালের রহস্যজনকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানের ঘটনাগুলো একই ধারাবাহিকতার অংশ হতে পারে।
এ ছাড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে বিদেশি গণমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থাগুলো দাবি করেছে, হামাসের দুই শীর্ষ নেতা পাকিস্তানের এক বিতর্কিত রাজনীতিকের সঙ্গে গোপনে ঢাকা সফর করেছিলেন। যদিও এসব দাবির বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবুও সাবেক ইউনূস সরকারের আমলে তালেবান ও হামাস নেতাদের কথিত গোপন ঢাকা সফরের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে সাদা-কালো কালেমা-খচিত পতাকার বিস্তার নতুন করে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন সামনে এনেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এক ভিডিও বক্তব্যে মুফতি হারুন ইজহার প্রকাশ্যে ‘কালেমার পতাকা’ ওড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল—এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, কালেমার পতাকাও থাকবে আমাদের।’
‘আল কুরআনের দারস’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গত ১৩ জুন প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি বিদেশি দেশের পতাকার পরিবর্তে কালেমা-খচিত পতাকা ব্যবহারের আহ্বান জানান। এর পর থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাদা ও কালো পতাকা টানানো, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, মিছিল এবং প্রকাশ্যে এসব পতাকা প্রদর্শনের ঘটনা বাড়তে থাকে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কয়েকজন অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা, ধর্মীয় বক্তা এবং সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক সংগঠনের সদস্য এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ নিজেদের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এসব পতাকা বিক্রি ও বিতরণের প্রচারও চালাচ্ছেন। তবে তাদের পেছনে কারা রয়েছেন, তারা কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক বা নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না—সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তদন্তের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন