ফাইল ছবি
আবারও সাইবার আইন নিয়ে নতুন বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘ক্ষতিকর’ কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিধানও যুক্ত করার কথা বলছে সরকার।
তবে এই উদ্যোগ ঘোষণার পরপরই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি ডিজিটাল পরিসরে জবাবদিহি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ, নাকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায়?
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামাজিক মাধ্যমে স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়ে কি না, তা ‘পুনরায় সংজ্ঞায়িত’ করা প্রয়োজন। তিনি জানান, সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণ এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হেলেন জেরিন খান সংসদে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক, এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইন হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের প্রধান, তার পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্য করে নানা ধরনের কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে সরকার মনে করছে।
সরকারের এই অবস্থানের পেছনে বাস্তব কিছু কারণ রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে ডিপফেক ভিডিও, কৃত্রিমভাবে তৈরি অডিও, ভুয়া ছবি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রচারণা ও সামাজিক উত্তেজনা তৈরিতে এসব প্রযুক্তির অপব্যবহারের নজিরও রয়েছে। দেশেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখা গেছে। ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্যের সত্যতা রক্ষার প্রশ্নটি পুরোপুরি অমূলক নয়।
কিন্তু উদ্বেগের জায়গাটি অন্যত্র। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন, তখন মানবাধিকারকর্মী, আইনবিদ এবং গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এ সংজ্ঞায়নের সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে? সমালোচনা, ব্যঙ্গচিত্র, রাজনৈতিক মন্তব্য কিংবা সরকারের নীতির বিরোধিতা—এসব কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে থাকবে, নাকি সেগুলোর কিছু অংশকে নতুন আইনি সংজ্ঞার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা হবে?
এই প্রশ্নগুলোর পেছনে রয়েছে দেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। গত এক দশকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে বারবার বিতর্ক হয়েছে। সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, এসব আইনের কিছু ধারা অস্পষ্ট ভাষায় লেখা হওয়ায় সেগুলো রাজনৈতিক সমালোচক, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত ২৩ এপ্রিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি বলেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী বা সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে অন্তত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা অতীতের দমনমূলক চর্চার ধারাবাহিকতার আশঙ্কা তৈরি করছে।
এইচআরডব্লিউ যে ঘটনাগুলোর উল্লেখ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে ১৭ এপ্রিল এ এম হাসান নাসিমের গ্রেপ্তার। অভিযোগ ছিল, তিনি একজন আইনপ্রণেতাকে নিয়ে একটি কার্টুন পোস্ট করেছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশের আওতায় মামলা করা হয়। তবে এ ঘটনায় দেশের অন্যতম ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তোলে, একটি সংবাদভিত্তিক ব্যঙ্গচিত্র কীভাবে ‘ব্ল্যাকমেল’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ ছাড়া ভোলায় জামায়াত-সমর্থক সওদা সুমি, ময়মনসিংহে আজিজুল হক এবং মুন্সিগঞ্জে শাওন মাহমুদকে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় কখনো ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা, কখনো সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, আবার কখনো সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর মতে, এসব ঘটনা এমন একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দেয় যেখানে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়তে পারে এমন বক্তব্যকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে। সংস্থাটি বলেছে, সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও এখনো অপরাধের সংজ্ঞা, তদন্তের ক্ষমতা এবং কনটেন্ট ব্লক করার বিধানে অপব্যবহারের সুযোগ রয়ে গেছে।
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ নাগরিকের চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এরও সদস্য। ওই চুক্তির ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি তাদের জেনারেল কমেন্ট নম্বর ৩৪-এ স্পষ্টভাবে বলেছে, অনলাইন মতপ্রকাশও এই অধিকারের আওতাভুক্ত এবং কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করতে হলে তা অবশ্যই সুনির্দিষ্ট, প্রয়োজনীয় এবং আইনগতভাবে পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে।
এখানেই এসে মূল বিতর্কটি তৈরি হয়েছে। সরকার বলছে, গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ঠেকাতে আইন সংশোধন প্রয়োজন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ বা ‘মানহানিকর কনটেন্ট’—এসব শব্দের সংজ্ঞা যদি অত্যন্ত বিস্তৃত বা অস্পষ্ট হয়, তাহলে তা সরকারের সমালোচনা দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে সাইবার আইনের আধুনিকায়ন প্রয়োজন হতে পারে। মেটা, গুগল, এক্স বা টিকটকের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মকে জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য কঠোর দায়িত্ববোধ আরোপ করা হয়েছে। তবে সেখানে একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার, বিচারিক তদারকি এবং আপিলের সুযোগও নিশ্চিত করা হয়েছে।
দেশে নতুন সংশোধনী কীভাবে তৈরি হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি আইনটি স্বচ্ছ পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয়, যেখানে সাংবাদিক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, আইনবিদ ও নাগরিক সমাজের মতামত নেওয়া হবে, তাহলে এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’কে সীমিত করার উদ্দেশ্যে অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়, তাহলে তা নতুন উদ্বেগের জন্ম দেবে।
অভিজ্ঞতা বলছে, আইনের ভাষার চেয়ে তার প্রয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে যেসব আইন মূলত সাইবার অপরাধ দমন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ফলে নতুন আইনের ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজের নজর থাকবে—গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলার নামে সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ বা ভিন্নমত প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে সরকার ডিজিটাল পরিসরে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি বাড়াতে চায়। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে, এই উদ্যোগ যেন মৌলিক অধিকার খর্ব করার পথে না যায়। ফলে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের প্রক্রিয়াটি এখন শুধু একটি আইনি সংস্কারের বিষয় নয়; এটি দেশের ডিজিটাল গণতন্ত্র, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কেও পরিণত হয়েছে।
আইনটির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের পরই বোঝা যাবে, সরকার ডিজিটাল যুগের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তুলছে, নাকি ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ পুনঃসংজ্ঞায়নের মাধ্যমে অনলাইন পরিসরে নতুন নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি নির্মাণ করছে। বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রশ্নটি তাই একটাই—নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য কোথায় টানা হবে।
খবরটি শেয়ার করুন