রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ

বিরোধী দলের বাজেট সমালোচনায় সরকারি দলের ক্ষোভ, সংসদে বাহাস

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ১২:২১ পূর্বাহ্ন, ১৭ই জুন ২০২৬

#

ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে সরকার ও বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। মঙ্গলবারের (১৬ জুন) অধিবেশনে সেই পার্থক্য একপর্যায়ে সরাসরি বাকবিতণ্ডায় রূপ নেয়। বিরোধী দলের সদস্যরা বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ ও ‘করনির্ভর’ বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে সরকারি দলের সদস্যরা বিরোধীদের সমালোচনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে বাজেটকে ‘জনবান্ধব’, ‘সংস্কারমুখী’ ও ‘বাস্তবধর্মী’ হিসেবে তুলে ধরেন।

এবারের বাজেট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং কর্মসংস্থান সংকটের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা।

কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। তাদের অভিযোগ, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত করের বোঝা গিয়ে পড়বে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে করের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি আরও বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার বিষয়টি সৎ করদাতাদের জন্য নিরুৎসাহব্যঞ্জক বার্তা বহন করে।

যশোর-৬ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোক্তার আলীও ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যে কর বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। একইভাবে কয়েকজন বিরোধী সদস্য দেশের সড়ক অবকাঠামো, স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কর-সংক্রান্ত চাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তবে সরকারি দলের সদস্যরা এসব সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে বেশ আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন। কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শরিফুল আলম বলেন, যে বাজেটে মদ ও তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে, সেটি নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি তাদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তার ভাষায়, “সমালোচনার জন্য সমালোচনা করা হচ্ছে।”

সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মমতাজ আলম বিরোধী দলের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তারা বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলো দেখছে না। তার ভাষায়, “ফুলের বাগানের ঘ্রাণ নিচ্ছে, কাঁটা নিচ্ছে না।”

বাজেট আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য জীবা আমিনা খানের বক্তব্য। তিনি প্রায় ১১ মিনিট ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন। দেশের ভাঙাচোরা সড়কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থা পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির ফল। তার বক্তব্যের কিছু অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং তা নিয়ে ব্যাপক হাস্যরসেরও সৃষ্টি হয়।

সংসদীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা হলেও জীবা আমিনার বক্তব্যের রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট—বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সমস্যার দায় অতীত শাসনের ওপর চাপিয়ে নিজেদের সংস্কার কর্মসূচির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চায়।

বাজেটের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি আসে দ্রব্যমূল্যের প্রসঙ্গ ঘিরে। বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, অতীতের বাজেটগুলোর পরপরই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যেত। কিন্তু এবার বাজেট ঘোষণার পর সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তিনি দাবি করেন, চাল, গম, আলু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর ফলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও মনে করেন, বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর ছাড় এবং আমদানি পর্যায়ে কিছু শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ সম্প্রতি গণমাধ্যমে বলেন, শুধু কর কমানোই যথেষ্ট নয়; বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে না পারলে ভোক্তা সেই সুবিধা পুরোপুরি পাবে না। অন্যদিকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছেন, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন হবে।

বাজেট আলোচনায় নারীর স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিপুন রায় চৌধুরী বলেন, স্যানিটারি ন্যাপকিনের কাঁচামাল আমদানিতে করসুবিধা বহাল রাখা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।

অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য আবুল হাসান মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানান। তার মতে, দেশের তরুণ সমাজকে মাদকের বিস্তার থেকে রক্ষা করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ই-টিন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার আশঙ্কা, এতে প্রান্তিক ও ছোট ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে পারেন। যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করার জন্যই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকার যে রাজস্বভিত্তি সম্প্রসারণের নীতি গ্রহণ করেছে, তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের দীর্ঘদিনের সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশে জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ব্যয় চালিয়ে যেতে করজাল সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। তবে সেই প্রক্রিয়ায় মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

সংসদে মঙ্গলবারের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে, বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো পক্ষের দ্বিমত নেই। বিরোধীরা করের চাপ, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে; সরকার বলছে, সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা ছাড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।

প্রস্তাবিত বাজেট এখন সংসদীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে আরও পর্যালোচনার মুখে পড়বে। তবে মঙ্গলবারের বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে বাজেটকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশাও থাকবে—বাজেটের কাগুজে প্রতিশ্রুতি যেন বাস্তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250