সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ২০ মাসে নদী থেকে ৯২০ মরদেহ উদ্ধার, হত্যার পর পানিতে ফেলার কৌশল কেন? *** প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত কূটনৈতিক সূচি, দুই মাসে চার দেশ সফরের আলোচনা *** ক্যারিয়ারে সফলতার শুরুতেই ডেঙ্গুতে প্রাণ হারালেন ডা. আঁচল রায় *** জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নাই: ফরহাদ মজহার *** আদাবরে ভবন দখলচেষ্টা: দেড় বছরে দেড় কোটি টাকা আদায় করেছিল একই দখলদার গ্রুপ *** আরও ১০০ পিংক বাস চালুর উদ্যোগ *** ড. ইউনূস আমলে গ্রেপ্তার, জামিনের একমাস পর মৃত্যু সাংবাদিকের, কিছু প্রশ্ন *** বাংলাদেশের কিসের এত দুশ্চিন্তা *** এমবাপ্পের চোট কতটা গুরুতর *** জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন সোমবার

সুখবর এক্সপ্লেইনার

২০ মাসে নদী থেকে ৯২০ মরদেহ উদ্ধার, হত্যার পর পানিতে ফেলার কৌশল কেন?

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০১:৫৩ পূর্বাহ্ন, ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশের বিভিন্ন নদী থেকে গত ২০ মাসে ৯২০টি মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। এর মধ্যে ২০২৫ সালে উদ্ধার হয়েছে ৫৪১টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আরও ৩৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এই তথ্য তুলে ধরে গতকাল রোববার ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ–এর  এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে নদী থেকে বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপরাধবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, হত্যার পর প্রমাণ নষ্ট করতে অপরাধীদের একটি অংশ নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার কৌশল ব্যবহার করছে।

অবশ্য নদী থেকে উদ্ধার হওয়া সব মরদেহ হত্যার শিকার—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও অন্যান্য কারণেও নদীতে মানুষের মৃত্যু হয়। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

নদীর স্রোত মরদেহকে ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে। ফলে যেখানে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেও মরদেহ পাওয়া যেতে পারে। কখনো অন্য জেলা থেকেও মরদেহ উদ্ধার হয়। এতে প্রকৃত ঘটনাস্থল শনাক্ত করা কঠিন হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ও ফরেনসিক বিজ্ঞানে হত্যার পর মরদেহ সরিয়ে ফেলার এই প্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে ‘বডি ডিসপোজাল’ বা মরদেহ অপসারণ বলা হয়। অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট বা তদন্তকে বিভ্রান্ত করতে মরদেহ এমন স্থানে ফেলে দিতে পারে, যেখানে সেটি দ্রুত শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাজ্যের অপরাধ তদন্তে কাজ করা পরিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্যারোলিন রবার্টস ‘ফরেনসিক হাইড্রোলজি’ বা ফরেনসিক জলবিদ্যার মাধ্যমে নদীতে মরদেহের সম্ভাব্য গতিপথ শনাক্ত করার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, নদীর স্রোত, জোয়ার-ভাটা ও পানির গতিবিধি বিশ্লেষণ করে মরদেহ কোথা থেকে পানিতে পড়েছিল, তার সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যায়।

ফরেনসিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, পানিতে থাকা মরদেহের গতিপথ নির্ধারণ জটিল। নদীর প্রস্থ, স্রোতের গতি, তীরের গঠন, পানির গভীরতা এবং মরদেহের ভাসা বা ডুবে যাওয়ার অবস্থার ওপর এর গতিবিধি নির্ভর করে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সম্ভাব্য অনুসন্ধান এলাকা নির্ধারণ করা যায়।

দেশের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। নিউ এজ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীতে মরদেহ ফেলে দিলে স্রোতে সেটি অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে। এতে হত্যার প্রকৃত স্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহ পচে যায়। আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

নিউ এজ–এর প্রতিবেদনে নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া ৩৭৯টি মরদেহের মধ্যে ২৭৮টির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ১০১টি মরদেহ তখনও অজ্ঞাত ছিল। ২০২৫ সালে উদ্ধার হওয়া ৫৪১টি মরদেহের মধ্যে ৩৭৫টির পরিচয় শনাক্ত হয়। ১৬৬টি থেকে যায় অজ্ঞাত।

২০২৫ সালে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৯০টি হত্যা মামলা এবং ৩৬৭টি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে হত্যা মামলা হয়েছে ৪৯টি। অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ২৭৬টি।

দেশের বিভিন্ন নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে এর আগেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশের প্রধান গণমাধ্যম। প্রথম আলো জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে নদী পুলিশ ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে ৬৩৯টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে নৌ পুলিশ ও অপরাধবিজ্ঞানীদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, হত্যার পর প্রমাণ নষ্ট করতে নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। স্রোতে মরদেহ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ায় হত্যার স্থান শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

ডেইলি স্টার–এর আগের এক প্রতিবেদনে অপরাধবিজ্ঞানী ওমর ফারুক বলেছিলেন, এক শ্রেণির হত্যাকারী প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নদীতে মরদেহ ফেলে দেয়। তার মতে, মরদেহ পচে গেলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। আবার মরদেহ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভেসে গেলে তদন্তকারীদের জন্য হত্যার ঘটনাস্থল শনাক্ত করা কঠিন হয়।

ডেইলি স্টারের আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নদী থেকে ৩০১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯২টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা তখনও বলেছিলেন, পানিতে পচনের কারণে মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের জন্যও নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ বড় চ্যালেঞ্জ। পানিতে থাকার কারণে শরীর ফুলে যায় ও পচন শুরু হয়। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী শরীরের নরম অংশ নষ্ট করতে পারে। নৌযানের ধাক্কায়ও মরদেহে এমন ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা দেখে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলার সময় ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ সোহেল মাহমুদ এমন সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন।

নিউ এজ–এর প্রতিবেদনে ফরেনসিক ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ মুজাহেরুল হক বলেছেন, নদীর পানি গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক আলামত নষ্ট বা দুর্বল করে দিতে পারে। পচন ও জলজ প্রাণীর কারণে নরম টিস্যু নষ্ট হয়ে গেলেও কিছু ক্ষেত্রে হাড় পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম নিউ এজকে বলেন, প্রতিটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে তারা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেন। মরদেহে হত্যার চিহ্ন থাকলে হত্যা মামলা করা হয়। পচে যাওয়া মরদেহের ক্ষেত্রে উদ্ধারের সময় পাওয়া সূত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়।

তবে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমানের বক্তব্য ভিন্ন উদ্বেগের কথা বলছে। তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে হত্যার পর মরদেহ নদীসহ বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আবার অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের পর দ্রুত অপমৃত্যুর মামলা করে দাফন করে দেওয়ার অভিযোগও তিনি করেছেন। তার মতে, অপমৃত্যুর মামলা করলেই রাষ্ট্রের তদন্তের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ৪৬৫টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই নদীর তীর, সড়ক, রেললাইন, মাঠসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ৪২টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রথম আলো–এর আগস্টের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে হত্যা, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। একই সময়ে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির কিছু শ্রেণির মামলা কমেছে। সাত ধরনের অপরাধে আগের ছয় মাসের তুলনায় মামলা বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

ডেইলি স্টার–এর সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হত্যা, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা বেড়েছে।

ফলে নদী থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি শুধু একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণও জরুরি। কোনো মরদেহ হত্যার শিকার কি না, তা প্রমাণ ছাড়া বলা যাবে না। তবে নদীর স্রোত যদি মরদেহকে ঘটনাস্থল থেকে দূরে নিয়ে যায় এবং পানিতে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তদন্ত যে কঠিন হয়ে পড়ে, তা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক ফরেনসিক গবেষণা—দুই ক্ষেত্রেই স্পষ্ট।

তাই ২০ মাসে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া ৯২০ মরদেহের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কতজনের পরিচয় পাওয়া গেল, তা নয়। প্রশ্ন হলো—এই মরদেহগুলোর কতগুলো দুর্ঘটনা, কতগুলো আত্মহত্যা এবং কতগুলো হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই উত্তর খুঁজতে দ্রুত পরিচয় শনাক্তকরণ, ডিএনএ সংরক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং নদীর স্রোত বিশ্লেষণসহ সমন্বিত তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

মরদেহ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250