রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ড. ইউনূস আমলে গ্রেপ্তার, জামিনের একমাস পর মৃত্যু সাংবাদিকের, কিছু প্রশ্ন *** বাংলাদেশের কিসের এত দুশ্চিন্তা *** এমবাপ্পের চোট কতটা গুরুতর *** জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন সোমবার *** জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৭ জন কারাগারে *** দফায় দফায় হামলা, ধ্বংসস্তূপ থেকে যেভাবে বেঁচে ফিরলেন মোজতবা খামেনি *** জাসদ কার্যালয়ে হামলা, মব সৃষ্টি ও আটকের ঘটনায় আসকের নিন্দা *** ঢাকায় তিন দিনে চার স্থানে হামলা-ভাঙচুর-লুট, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা *** দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি *** পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করা ২৮ সশস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যার দাবি তালেবানের

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ড. ইউনূস আমলে গ্রেপ্তার, জামিনের একমাস পর মৃত্যু সাংবাদিকের, কিছু প্রশ্ন

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ০৯:০১ অপরাহ্ন, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আজহার আলী সরকারের কারাবাসের শেষ অধ্যায়টি ছিল অসুস্থতা, আদালতে হুইলচেয়ারে হাজিরা এবং জামিনের দীর্ঘ অপেক্ষায়। অবশেষে জামিনে মুক্ত হওয়ার প্রায় এক মাস পর তার মৃত্যু হলো। এতে তার গ্রেপ্তার, কারাবাসে চিকিৎসা এবং একের পর এক মামলায় তাকে আটকে রাখার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

৫৭ বছর বয়সী আজহার আলী সরকার আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় পরিবার। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথে তার মৃত্যু হয়।

তার স্ত্রী রোকসানা পারভীন সুখবর ডটকমকে জানান, দুপুর ১টা ১০ মিনিটের দিকে তারা শমরিতা হাসপাতাল থেকে বের হন। পথেই আজহার আলী মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। তার দুই ছেলে রয়েছে। রোববার আসরের নামাজের পর বনশ্রীর আইডিয়াল মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

আজহার আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসা থেকে তাকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরিবারের ভাষ্য ছিল, ডিবির একটি দল তাকে বাসা থেকে নিয়ে যায়। পরদিন তাকে রমনা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

ওই মামলার সূত্রপাত আরও এক আলোচিত গ্রেপ্তারকে ঘিরে। ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডের মন্ত্রিপাড়া এলাকায় একটি প্রাডো গাড়িতে ঘোরাফেরা করছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরী। পুলিশের দাবি, তার চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় গাড়িটি থামানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে তাকে আটক করা হয়।

আদালতের নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যে এনায়েত করিমকে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগের কথা আসে। তিনি নিজেকে ‘মাসুদ করিম’ নামে পরিচয় দিতেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান বলে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তার কাছ থেকে দুটি আইফোন জব্দের কথা জানায় পুলিশ। পরে এসব তথ্যের ভিত্তিতে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা মামলায় উল্লেখ করা হয়।

এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে রমনা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে আরও রিমান্ড হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর এনায়েত করিম ও এসএম গোলাম মোস্তফা আজাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের খবরও প্রকাশিত হয়। এই মামলায় এনায়েত করিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন এসএম গোলাম মোস্তফা আজাদ, জাতীয় পার্টির রওশনপন্থী অংশের মহাসচিব কাজী মামুনুর রশীদ, যুব সংহতির নেতা রিফাতুল ইসলাম পাভেল এবং সাংবাদিক আজহার আলী সরকার। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক শওকত মাহমুদের নামও পরে এই মামলার সঙ্গে যুক্ত হয়। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল।

শওকত মাহমুদ অবশ্য এখন কারাগারে নেই। শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিন পাওয়ার পর গত ২৬ মে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। অর্থাৎ এনায়েত করিমকে ঘিরে করা মামলার পর গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে তার কারাবাসও দীর্ঘ হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তিনি জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

আজহার আলীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এ মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও মুক্তি নিশ্চিত হয়নি। ১৮ জুন তাকে শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। সেই মামলার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘মঞ্চ ৭১’-এর একটি আলোচনা অনুষ্ঠানকে ঘিরে সংঘর্ষ ও আটকের ঘটনায়। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা লতিফ সিদ্দিকী, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না, অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জনসহ কয়েকজনকে আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।

আজহার আলীর জামিন শুনানির একটি দৃশ্য তার কারাবাসের শারীরিক অবস্থারও ইঙ্গিত দেয়। গত ২৯ জুন তাকে হুইলচেয়ারে করে আদালতে হাজির করা হয়। এর আগে একাধিকবার অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জামিন চাওয়া হলেও তা মঞ্জুর হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে কারাগারে তার যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৭ আগস্ট আদালত তাকে জামিন দেন। কিন্তু মুক্ত জীবনের সময়টি দীর্ঘ হলো না। জামিনের ৪১ দিনের মাথায় তার মৃত্যু হলো।

আজহার আলীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগও নেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একাধিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাইয়ের আন্দোলন ঘিরে করা একাধিক হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০২৬ সালের ১১ মে হাইকোর্ট শাকিলকে পাঁচটি এবং ফারজানাকে ছয়টি মামলায় জামিন দেন। কিন্তু ৭ জুন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত তাদের ওই জামিন স্থগিত করেন। ফলে তারা কারামুক্ত হতে পারেননি।

সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবুও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। গত ৫ মে বনানী থানার চাঁদাবাজির মামলায় হাইকোর্ট তার জামিন আবেদন নাকচ করেন। একই সময়ে বাড্ডা থানার হত্যা মামলাতেও তার জামিন হয়নি।

সাংবাদিক শ্যামল দত্তও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হন। চলতি সেপ্টেম্বরেও তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নেওয়া এবং সেফহোমে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রবীণ সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাকে একাধিক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তিনি কারাগারে রয়েছেন।

তবে এই তালিকায় আনিস আলমগীরের অবস্থাটি আলাদা। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাকে ডিবি গ্রেপ্তার করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ২০২৬ সালের ৫ মার্চ হাইকোর্ট তার জামিন দেন। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাতেও জামিন পান তিনি। ১৪ মার্চ তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হন। মে মাসে ওই মামলায় তার জামিন স্থায়ী করা হয়।

আজহার আলী সরকারের মৃত্যু তাই শুধু একজন সাংবাদিকের মৃত্যুর খবর নয়। এটি কারাগারে অসুস্থ আসামির চিকিৎসা, দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকা, এক মামলায় জামিনের পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার মতো প্রশ্ন সামনে এনেছে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছিল, সেগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তির আগেই তিনি মারা গেলেন। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগও আর তার ক্ষেত্রে থাকল না।

একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা, দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা এবং অসুস্থ অবস্থায় জামিন পেতে দীর্ঘ সময় লাগার পুরো প্রক্রিয়াটি এখন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনছে। আজহার আলীর মৃত্যু সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে।

সাংবাদিক আজহার আলী সরকার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250